মোঃ মাজহারুল ইসলাম: | মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর খবর প্রকাশ হওয়ার পর কয়েকদিন ফেসবুকের নিউজফিড ভরে গিয়েছিল ক্ষোভে। কমেন্ট বক্সে সন্তানদের প্রতি ধিক্কার, টকশোতে বিশ্লেষণ, পত্রিকায় সম্পাদকীয়। আমিও নিজেও লিখেছি কয়েকটি পত্রিকায়। মানুষ কাঁদল, ক্ষুব্ধ হলো, শেয়ার করল। তারপর কী হলো?

একটা নতুন ঘটনা এলো। হয়তো একটা দুর্ঘটনা, একটা রাজনৈতিক বিতর্ক, একটা ভাইরাল ভিডিও। নূরজাহান হারিয়ে গেলেন টাইমলাইনের নিচে। যে সন্তানরা মায়ের লাশের সামনে সাংবাদিকের পকেটে টাকা গুঁজে দিতে চেয়েছিল, তাদের নিয়ে আলোচনা থেমে গেল। যে নীতি নির্ধারকরা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেছিলেন, তাদের কথাও থেমে গেল।
আমি একজন সার্টিফাইড মেন্টাল হেলথ কাউন্সিলর, সমাজকর্মী এবং জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী হিসেবে এই প্রশ্নটা করতে চাই, আমরা কি আসলেই নূরজাহানের জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, নাকি ক্ষুব্ধ হওয়ার অনুভূতিটার জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম?
এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য বিশাল—
এক. আমাদের মস্তিষ্ক কেন দ্রুত ভুলে যায়?
মনোবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে, আউটরেজ ফ্যাটিগ বা ক্ষোভ-ক্লান্তি। মানুষের মস্তিষ্ক একটানা তীব্র আবেগ ধরে রাখতে পারে না। এটা একটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যদি প্রতিটি অন্যায়ের ভার আমরা মনে বহন করতাম, তাহলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তাম। তাই মস্তিষ্ক একটা নির্দিষ্ট সময় পর আবেগকে স্তিমিত করে দেয়, নতুন উদ্দীপনার দিকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
এটা স্বাভাবিক একটা মানসিক প্রক্রিয়া। সমস্যা তখনই হয়, যখন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটাকেই আমরা সমাধান ভেবে বসি। ক্ষোভ প্রকাশ করাটাকেই যদি আমরা কিছু একটা করা মনে করি, তাহলে ক্ষোভ কমে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের দায়িত্ববোধও কমে যায়।
সামাজিক মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। একটা পোস্টে রিঅ্যাক্ট দেওয়া, একটা কমেন্ট লেখা, এই ছোট্ট কাজটা মস্তিষ্কে একধরনের তৃপ্তি তৈরি করে, যেন দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে। মনোবিজ্ঞানে একে বলে ÔMoral licensingÕ–ছোট একটা নৈতিক কাজ করে ফেললে মানুষ নিজেকে বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত মনে করে।
দুই. মিডিয়ার মনোযোগ-অর্থনীতি এবং আমাদের যৌথ বিস্মৃতি—
মিডিয়া বাঁচে মনোযোগের উপর। নতুন খবর পুরনো খবরকে ঠেলে সরিয়ে দেয়, এটাই মিডিয়ার প্রকৃতি। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা দর্শক-পাঠক হিসেবে মিডিয়ার এই ছন্দের সাথে নিজেদের নৈতিক স্মৃতিকেও মিলিয়ে ফেলি। মিডিয়া যতদিন কথা বলে, আমরাও ততদিন মনে রাখি। মিডিয়া থেমে গেলে, আমরাও থেমে যাই।
অথচ একটা ঘটনার সামাজিক গুরুত্ব মিডিয়া কভারেজের দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক নয়। নূরজাহানের মৃত্যু যে কাঠামোগত সংকট প্রকাশ করেছে- প্রবীণদের প্রতি অবহেলা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব, সেই সংকট মিডিয়ার আলোচনা থেমে যাওয়ার পরও ঠিক ততটাই বাস্তব থেকে যায়। বরং আলোচনা থেমে যাওয়ার পরই আসল কাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা সেই মুহূর্তে অন্য কোনো ঘটনার পেছনে ছুটতে শুরু করি।
তিন. ক্ষোভ প্রকাশ কেন যথেষ্ট নয়—
একজন কাউন্সিলর হিসেবে আমি প্রতিদিন দেখি, তীব্র আবেগ প্রকাশ করাটা সহজ, কিন্তু সেই আবেগকে টেকসই আচরণে রূপান্তর করা কঠিন। একজন মানুষ রাগ প্রকাশ করে হালকা বোধ করতে পারেন, কিন্তু সেই রাগের উৎস যদি অনালোচিত থেকে যায়, রাগ আবার ফিরে আসে, নতুন মোড়কে, নতুন ঘটনার আকারে।
সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা নূরজাহানের ঘটনা ক্ষুব্ধ হলাম, কিন্তু প্রশ্ন তুললাম না, কতজন বৃদ্ধ এই মুহূর্তে ঢাকার কোনো ফ্ল্যাটে একা পড়ে আছেন, যাদের খবর কেউ রাখছে না? আমরা প্রশ্ন তুললাম না, প্রবীণ নিরাপত্তা আইন কেন কার্যকর হয় না? কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রবীণ পরিচর্যা ব্যবস্থা তৈরিতে বাজেট বরাদ্দ কতটুকু? আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে গেলাম, কারণ ক্ষোভ প্রকাশ করাটা প্রশ্ন তোলা এবং উত্তর খোঁজার চেয়ে অনেক সহজ।
চার. নীতিনির্ধারণী স্তরে বিস্মৃতির মাশুল—
ব্যক্তি পর্যায়ে ভুলে যাওয়া যতটা ক্ষতিকর, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভুলে যাওয়া তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। একটা ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কমিটি গঠিত হয়, বিবৃতি আসে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু জনমনোযোগ সরে গেলে সেই কমিটি, সেই প্রতিশ্রুতি নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। কারণ নীতিনির্ধারকরাও জানেন, জনমত এখন আর নূরজাহানের ঘটনায় নেই।
এভাবেই আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলো সমাধানহীন থেকে যায়, সমাধানের অভাবে নয়, ধারাবাহিক মনোযোগের অভাবে। প্রতিটি ঘটনা একটা আলাদা সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়, কোনো ঘটনাকেই একটা বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা হয় না।
পাঁচ. আমরা কী করতে পারি—
আমি মনে করি না ক্ষোভ প্রকাশ করা ভুল। ক্ষোভ একটা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় মানবিক প্রতিক্রিয়া। সমস্যা ক্ষোভে নয়, ক্ষোভের পরে যে শূন্যতা তৈরি হয় তাতে।
ব্যক্তি পর্যায়ে, আমরা যদি সত্যিই কোনো ঘটনায় বিচলিত হই, সেই বিচলন থেকে একটা ছোট্ট, টেকসই কাজে যুক্ত হতে পারি, নিজের এলাকার প্রবীণদের খোঁজ নেওয়া, স্থানীয় কোনো উদ্যোগে সময় দেওয়া। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে, সাংবাদিক এবং গবেষকরা Ôfollow-up reportingÕ বা অনুসরণমূলক প্রতিবেদনের চর্চা বাড়াতে পারেন, একটা ঘটনার তিন মাস পর, ছয় মাস পর কী হলো, তা নিয়েও লেখা। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, প্রতিটি বড় সামাজিক ঘটনার পর একটা নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ জবাবদিহিতামূলক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত, যাতে প্রতিশ্রুতিগুলো জনমনোযোগ সরে যাওয়ার পরও কাগজে-কলমে আটকে না থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের সামাজিক স্মৃতিকে ঘটনাভিত্তিক না রেখে কাঠামোভিত্তিক করে তোলা। নূরজাহান একটা নাম নয়, একটা লক্ষণ। এই লক্ষণের পেছনের রোগ, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাব, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের দুর্বলতা, এই রোগ সারানোই আসল কাজ। আর সেই কাজ একদিনের ক্ষোভে হয় না, বছরের পর বছর মনোযোগ ধরে রাখার মধ্য দিয়ে হয়।
নূরজাহান বেগমের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হবে, যদি আমরা তাঁর মৃতুকে একটা মুহূর্তের আবেগ না বানিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের সূচনা বিন্দু বানাতে পারি।
লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
সার্টিফাইড মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর
সমাজকর্মী ও কলামিস্ট
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com