বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি | শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ২২৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) স্নাতক প্রথম বর্ষে দ্বিতীয়বার (সেকেন্ড টাইম) ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ পুনর্বহাল, মেধার ন্যায্য মূল্যায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য (ভিসি) বরাবর নীতিগত প্রস্তাবনা ও স্মারকলিপি জমা দিয়েছে ২০২৫ সালের এইচএসসি ও আলিম ব্যাচের ভর্তি প্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা।
গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এই স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।
২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী স্বাধীন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক হঠকারিতা বা আমলাতান্ত্রিক জেদ মেনে নেওয়া হবে না উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের দরজা সাধারণ মানুষের সন্তানদের জন্য উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
তারা বলেন মেধার কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ নেই
স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ রুদ্ধ করার যে হঠকারী ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে এক নিষ্ঠুর মেধা-নিধন প্রকল্পে রূপান্তরিত করেছে।
মাত্র দেড় ঘণ্টার একটি যান্ত্রিক পরীক্ষা কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর ১২ বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা মেধার চূড়ান্ত বিচারদণ্ড হতে পারে না। আকস্মিক অসুস্থতা, তীব্র যানজট বা পরীক্ষার হলের সাময়িক মানসিক চাপের কারণে প্রথমবার পরীক্ষা খারাপ হওয়াটা এক ঘণ্টার একটি মানবিক ভুল, কিন্তু তার জন্য জীবনের সমস্ত পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া কোনো প্রগতিশীল শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষণ নয়। এটি আসলে পরীক্ষার নামে একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ গিলোটিন।
শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তোলেন, খাবার বা ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়, কিন্তু মেধার কি কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ (Expiry Date) আছে? গত বছর যে শিক্ষার্থী যোগ্য ছিল, এ বছর সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য হয়ে যাওয়ার অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কোনো মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ বিসিএস পরীক্ষায় যদি ৪ থেকে ৫ বার সুযোগ থাকতে পারে, তবে উচ্চশিক্ষার দ্বার কেন প্রথমবারেই রুদ্ধ হবে?
তারা বলেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্মারকলিপিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে এই নিয়ম ডিজিটাল ডিভাইড ও ভৌগোলিক বৈষম্য তৈরি করছে। কুড়িগ্রাম, বান্দরবান, লালমনিরহাট কিংবা ভোলার একজন প্রান্তিক শিক্ষার্থী প্রথমবার পরীক্ষা দেয় মূলত পরিবেশ ও যুদ্ধের ময়দান চেনার অভিজ্ঞতা হিসেবে, কারণ তারা রাজধানীর মতো উন্নত কোচিং বা ইন্টারনেটের সুবিধা পায় না। তারা যখন নিজের ঘাটতি পূরণ করে দ্বিতীয়বার লড়তে চায়, তখনই ঢাবির গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এটি পরোক্ষভাবে শহুরে উচ্চবিত্ত শ্রেণির জন্য আসন সংরক্ষণ করা এবং গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে হত্যা করা, যা সংবিধানের ১৯ (১) অনুচ্ছেদের (সুযোগের সমতা) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৮-১৯ বছর বয়সের একজন কিশোরের সামনে সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে পরোক্ষভাবে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিগত বছরগুলোর আত্মহত্যার পরিসংখ্যান টেনে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনারা যাকে নিয়ম বলছেন, আমরা তাকে মেধার কসাইখানা বলছি। শিক্ষাব্যবস্থা কি আমাদের তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ বানাতে চায়, নাকি জ্যান্ত দাফন করতে চায়?
তাদের স্মারকলিপিতে জাতীয় অর্থনীতিতে এই নিয়মের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে বলা হয়, একজন নাগরিককে এইচএসসি পর্যন্ত গড়ে তুলতে রাষ্ট্র যে বিপুল ভর্তুকি দেয়, তা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় সেই বিনিয়োগ মুহূর্তেই ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা মৃত পুঁজিতে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে একাডেমিক মিসম্যাচ তৈরি হচ্ছে এবং সমাজ একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হারানোর পাশাপাশি জন্ম নিচ্ছে এক অনিচ্ছুক গ্র্যাজুয়েট, যা দেশের জিডিপিতে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।
একই সাথে, ঢাবির এই বিতর্কিত নিয়ম মেধাবীদের দেশত্যাগে পুশ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের দরজা বন্ধ দেখে যোগ্য শিক্ষার্থীরা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপের ফর্ম পূরণ করছে, যার ফলে দেশি মেধা বিদেশি বাজারের কাঁচামালে রূপান্তর হচ্ছে এবং অন্য দেশের জিডিপি বাড়াচ্ছে।
প্রশাসনের শঙ্কার বিপরীতে শিক্ষার্থীরা অকাট্য গাণিতিক ও নীতিগত সমাধান তুলে ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অতীতে সেকেন্ড টাইম বন্ধের সপক্ষে যে সমস্ত কারিগরি জটিলতার কথা বলেছিল, আধুনিক পলিসি মেকিংয়ের যুগে সেগুলোকে আমলাতান্ত্রিক অলসতার অজুহাত হিসেবে খণ্ডন করে সুনির্দিষ্ট গাণিতিক মডেল প্রস্তাব করেছেন আন্দোলনকারীরাঃ
দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নম্বর সমন্বয় পদ্ধতিঃ সেকেন্ড টাইম চালু করলে শিক্ষার্থীরা ঢাবির পেছনের সারির বা অপছন্দের বিষয়ে ভর্তি হয়ে সিট আটকে রাখে এবং পরবর্তী বছর অন্য কোথাও চলে যায় প্রশাসনের এই শঙ্কা উধাও করতে শিক্ষার্থীরা ইনসাফভিত্তিক পলিসি’র প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে ভর্তি থাকা কোনো শিক্ষার্থী পুনরায় ঢাবিতে পরীক্ষা দিলে তার মোট প্রাপ্ত নম্বর থেকে এক ধাক্কায় ৬ (ছয়) নম্বর কর্তন করা হোক। আর যারা কোথাও ভর্তি হয়নি, তাদের ৩ নম্বর কাটা যাবে। ভর্তি পরীক্ষায় ৬ নম্বর কাটা যাওয়া এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা, যার ফলে কেবল সাবজেক্ট পরিবর্তন করতে চরম মরিয়া ও আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থীরাই আসবে এবং খামখেয়ালি করে আসন নষ্ট হওয়ার হার এক ধাক্কায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
স্বয়ংক্রিয় বাফার সিট (Buffer Seat) ও ড্রপআউট ডাটা মডেলঃ সেশন চলাকালীন বা এক বছর পর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বা বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণে শিক্ষার্থীদের যে স্বাভাবিক স্থানচ্যুতি বা ড্রপআউট ঘটে, তা মোকাবিলার জন্য বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (যেমন ভারতের IIT) সফল মডেল অনুসরণের দাবি জানানো হয়েছে। বিগত বছরগুলোর গড় ড্রপআউট ডাটা অ্যানালাইসিস করে প্রতি বিভাগে শুরুতেই ৫% বা ১০% বাফার সিট বা অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি রাখলে মূল আসন সংখ্যা সবসময় ১০০% পূর্ণ থাকবে এবং প্রশাসনকে ক্লাস চলাকালীন কোনো বাড়তি লজিস্টিক খাটুনি পোহাতে হবে না।
আন্তর্জাতিক মডেল ও ঐতিহ্যের ইতিহাস
স্মারকলিপিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উল্লেখ করে বলা হয়, বিশ্বের বৃহত্তম ও কঠোর ভর্তি পরীক্ষা চীনের ‘গাওকাও’ (Gaokao)-এ একজন শিক্ষার্থী জীবনে যতবার খুশি পরীক্ষা দিতে পারে, সেখানে কোনো স্বৈরাচারী আইনি বা প্রশাসনিক সীমারেখা নেই। চীনের সিংহুয়া বা পেকিং ইউনিভার্সিটির মতো বৈশ্বিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো আসন খালি হওয়ার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের অধিকার কেড়ে নেয়নি, বরং বাফার সিট মডেল দিয়ে তা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড বা এমআইটি-তেও মেধার কোনো এক্সপায়ারি ডেট থাকে না, বরং গ্যাপ ইয়ার বা দ্বিতীয়বার সুযোগকে শিক্ষার্থীর মানসিক পরিপক্কতার লক্ষণ ধরা হয়। এমনকি প্রতিবেশী ভারতের আইআইটি (IIT)-তেও পরপর দুইবার পরীক্ষা দেওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা মনে করিয়ে দেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৯৩ বছর এই সেকেন্ড টাইম ভর্তি পরীক্ষা সফলভাবে চালু ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী সরকারের তল্পিবাহক প্রশাসন মুক্তচিন্তা ও লড়াকু মেধাবীদের ক্যাম্পাসে আসা আটকাতে এবং শিক্ষার্থীদের কোণঠাসা করতে এই একতরফা কালো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল। দেশ থেকে স্বৈরাচারের পতন হলেও প্রশাসন এখনো সেই গণবিরোধী নিয়ম আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যা চরম লজ্জাজনক।বর্তমানে দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজসমূহ, গুচ্ছভুক্ত ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রায় সব শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড টাইম ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ সফলভাবে চালু রয়েছে।
উচ্চশিক্ষা কোনো প্রশাসনিক করুণা বা দান নয়, এটি জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় পরিচালিত বিদ্যাপীঠে প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের জন্মগত অধিকার। তাই আমলাতান্ত্রিক সংকীর্ণতা ও কৃত্রিম এলিটিজমের অহংবোধ পরিহার করে অবিলম্বে একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভা আহ্বান এবং একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেকেন্ড টাইম ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের জন্য উপাচার্যের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com