শফিকুল ইসলাম বাদল | সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬৮০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের জনবল সংকটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা চরম চাপের মুখে পড়েছে। উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ২১৭টি সরকারি এবং দুটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৬৯টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। বাকি ১৫০টি বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হওয়ায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও রয়েছে তীব্র জনবল সংকট। জনবল কাঠামো অনুযায়ী একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। ছয়টি অফিস সহায়ক পদের বিপরীতে কার্যরত রয়েছেন একজন হিসাব সহকারী। করণিক ও পিয়নের পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিক্ষক ও ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম তদারকিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনকে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানায়, অনেক বিদ্যালয়ে মাত্র তিন থেকে চারজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যা শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব ফেলছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের অধিকাংশ সময় প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হচ্ছে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হওয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
শ্যামগ্রাম দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে ২০২১ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। ২০২৫ সালে আমি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করি। প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে।”
আটিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, “১১ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও একজন কর্মকর্তা দিয়ে পুরো উপজেলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অফিসে প্রয়োজনীয় কর্মচারীও নেই। ফলে অফিসিয়াল কাজ করতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন পরিস্থিতি দেখিনি।”
গোসাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ তাসলিমা জাহান বলেন, “সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। প্রশাসনিক কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা যায় না। কর্মকর্তারা অনেক সময় পরিদর্শনে থাকায় অফিসে অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হয় না।”
প্রাথমিক শিক্ষক নেতা ও আলিয়াবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম সবুজ বলেন, “প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্বের মূল ভিত্তি। দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকলে শিক্ষার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত সব শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।”
শ্যামগ্রাম দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. রোস্তম আহাম্মদ বলেন, “২০২১ সাল থেকে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত নিয়োগ না দিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব সহকারী আবু হানিফ জানান, “২০১২ সালে যোগদানের সময় অফিসে চারজন কর্মচারী ছিল। পরে পর্যায়ক্রমে সবাই অবসরে চলে যান। বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে আমি একাই অফিসের অধিকাংশ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছি।”
তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উম্মে সালমা জানান, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। প্রতি মাসে হালনাগাদ তথ্য পাঠানো হচ্ছে এবং পদোন্নতির জন্য যোগ্য শিক্ষকদের তালিকাও প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুতই শূন্য পদগুলো পূরণ হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও অন্যান্য শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ওপর পড়বে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com