আসাদুজ্জামান তালুকদার,নেত্রকোণা জেলা : | রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২০২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
মাত্র ১৫০ টাকায় গাঁজার পুড়িয়া এবং ৩৫০ টাকায় ইয়াবা ট্যাবলেট—এত সহজলভ্য ও কম দামে মাদক পাওয়ায় নেত্রকোণা জেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তি। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত গড়ে উঠেছে মাদক বিক্রির অসংখ্য স্পট। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই চলছে গাঁজা ও ইয়াবার অবাধ বেচাকেনা, যা তরুণ ও যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হলেও কার্যকরভাবে এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাদের দাবি, কিছু অসাধু চক্রের প্রভাব এবং প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়েই বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে মাদক কারবারিরা।
মাদকের সহজলভ্যতার কারণে কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ দ্রুত এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো সমাজে। চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, পারিবারিক সহিংসতা এবং নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।
একের পর এক অভিযানে ধরা পড়ছে মাদক কারবারি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে নেত্রকোণার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও গাঁজাসহ একাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক অভিযানে কেন্দুয়ায় একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে প্রায় ৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ মরিয়ম বেগম (৩৬) আটক হন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ও তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার চালান এনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতেন।
এছাড়া রাজেন্দ্রপুর এলাকায় আল আমিন (৩২), মো. রাসেল (২৮) ও মো. বাবুল মিয়া (৪৮)-কে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটকের প্রক্রিয়া চালানো হয়। বারহাট্টা উপজেলায় পৃথক অভিযানে রুহল আমিন (৩৫) ও মো. রুবেল মিয়া (২৮)-কে যথাক্রমে ১ হাজার ৫০০ ও ৭০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মদন উপজেলার অভিযানে সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সদস্য হিসেবে মো. তরিকুল ইসলাম (৩৯) গ্রেপ্তার হন। একইভাবে মো. জাহান মিয়া (২৮) ২০০ পিস ইয়াবাসহ আটক হন। পূর্বধলার মো. খোরশেদ আলম ওরফে আলম (৩২)-এর নামও একাধিক পুলিশি অভিযানে উঠে এসেছে।
গাঁজার বড় চালানও উদ্ধার
শুধু ইয়াবা নয়, গাঁজা পাচার ও বিক্রির বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন। চলতি বছরের এপ্রিলে কেন্দুয়া থানার দামিনা মোড় এলাকায় ২৮ কেজি গাঁজাসহ মো. জিল্লুর রহমান (৪৪)-কে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
এর আগে ২০২৫ সালে বাবুল মিয়া-কে তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ১ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া মোহনগঞ্জ, মদনসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযানে ৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত গাঁজা উদ্ধার হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ: প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বিক্রি
স্থানীয়দের অভিযোগ, নেত্রকোণা শহরের কোর্ট স্টেশন ও বড় স্টেশন এলাকায় অনিক, এবং নাগড়া মহল্লার মন্টু করণিক ওরফে রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
অভিযোগ রয়েছে, উত্তর নাগড়া মহল্লার স্বপন দাশের দোকানের সামনে, বিনোদ বিড়ি ফ্যাক্টরি সংলগ্ন চায়ের দোকান এবং সুধাংশুর চায়ের দোকান এলাকায় প্রতিদিন প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। এলাকাবাসীর ভাষ্য, সেখানে ছোট ছোট শিশু, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণদের আনাগোনা থাকলেও প্রকাশ্যেই গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি করা হয়।
প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
জেলা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে মাদকের সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।
সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; মাদক ব্যবসার মূল হোতা, অর্থদাতা এবং সরবরাহকারী নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
নেত্রকোণার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—মাদক নির্মূলে আরও কঠোর, ধারাবাহিক ও আরো নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে জেলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা হবে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com