শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

প্রযুক্তির আশীর্বাদ নাকি আসক্তি? নোমোফোবিয়া নিয়ে নতুন ভাবনা

জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিক ও কলামিস্ট:   |   রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৬৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

প্রযুক্তির আশীর্বাদ নাকি আসক্তি? নোমোফোবিয়া নিয়ে নতুন ভাবনা
৮২

বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ফোন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তবে একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন কিছু মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অন্যতম হলো নোমোফোবিয়া (Nomophobia)— মোবাইল ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অযৌক্তিক ভয় বা উদ্বেগ।

বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েকশ কোটি ছাড়িয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবার কারণে মানুষের জীবন ক্রমেই স্মার্টফোনকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ফলে মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়া, চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনা অনেকের জন্য সাধারণ অসুবিধার চেয়ে বড় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নোমোফোবিয়া এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো পৃথক মানসিক রোগ না হলেও এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমস্যা। মোবাইল ফোন কাছে না থাকলে উদ্বেগ, অস্থিরতা, বিরক্তি, ভয় কিংবা অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হওয়াই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। অনেকেই বারবার ফোন চেক করেন, কোনো নোটিফিকেশন না এলেও স্ক্রিন অন করে দেখেন অথবা কয়েক মিনিট ফোন ব্যবহার না করলেই অস্বস্তি অনুভব করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের কার্যক্রম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের নোটিফিকেশন মানুষের মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস নির্ভরতায় রূপ নেয়। যখন সেই উৎস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের শূন্যতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

নোমোফোবিয়ার লক্ষণ সাধারণত দুই ধরনের— মানসিক ও শারীরিক। মানসিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, ভয়, মনোযোগের ঘাটতি, বিরক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। অন্যদিকে শারীরিক লক্ষণের মধ্যে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া, হাত কাঁপা, শ্বাস-প্রশ্বাসে অস্বস্তি কিংবা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব লক্ষণ অব্যাহত থাকলে তা ব্যক্তির কর্মক্ষমতা, শিক্ষাজীবন এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম নোমোফোবিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তারা প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত। বর্তমানে অনেক তরুণের দিনের শুরু এবং শেষ হয় স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং স্মার্ট প্রযুক্তির বিস্তারের এই যুগে নোমোফোবিয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের নির্ভরতাও তত বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ‘ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং’ এবং ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।

নোমোফোবিয়া থেকে মুক্ত থাকতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো, বই পড়া, খেলাধুলা কিংবা সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার না করা এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়কে ‘স্ক্রিনমুক্ত সময়’ হিসেবে নির্ধারণ করা কার্যকর হতে পারে।

প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। তাই প্রযুক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু তার দাসে পরিণত হওয়া যাবে না। স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে বাস্তব জীবন, মানবিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার চেয়ে কোনো প্রযুক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। নোমোফোবিয়ার মতো সমস্যাগুলো আমাদের সেই বাস্তবতাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ডিজিটাল যুগে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়তে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

 

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com