আনোয়ার হোসেন | শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪২৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঝাঁঝর আর ঢোলের গমগম আওয়াজ, বাতাসে ওড়ে ধূপের ধোঁয়া, আর মাঠের চারপাশ ঘিরে হাজারো মানুষের টানটান উত্তেজনা। মাঠের ঠিক মাঝখানে মাটিতে পুঁতে রাখা হয় একটি কলাগাছ। তার ওপরে বাঁধা হয় এক বিশেষ কবজ বা তাবিজ। আর তাকে কেন্দ্র করেই চলে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। কেউ একে বলেন তান্ত্রিক ও ওঝাদের ‘কালো জাদুর’ পরীক্ষা, আবার বিজ্ঞানমনস্কদের চোখে এটি স্রেফ লোক ঠকানো মনস্তাত্ত্বিক কৌশল বা সম্মোহন বিদ্যা। গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতির অন্যতম এক রোমাঞ্চকর ও রহস্যময় অধ্যায় ‘পাতা খেলা’। বর্ষার শেষে আশ্বিন থেকে পৌষের শীতের আমেজ শুরু হওয়া পর্যন্ত গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে আজও জমে ওঠে শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী খেলা।
কী এই ‘পাতা খেলা’?
খেলার নিয়মটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই অদ্ভুত। মাঠের মাঝখানে বৃত্তাকার সীমানার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকেন কয়েকজন মানুষ, লোকভাষায় যাদের বলা হয় ‘পাতা’। এই পাতারা সাধারণত ‘তুলা রাশি’র মানুষ হয়ে থাকেন বলে লোকবিশ্বাস। আর বৃত্তের বাইরে চারপাশ থেকে ঘিরে থাকেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ওঝা বা তান্ত্রিকদের দল। তান্ত্রিকরা দূর থেকে মন্ত্র পড়ে, হাততালি দিয়ে বা বিশেষ ভঙ্গিতে ইশারা করে মাঝের ‘পাতা’দের নিজের দিকে টানার চেষ্টা করেন। যে তান্ত্রিকের মন্ত্রের জোরে (বা কৌশলে) আকৃষ্ট হয়ে পাতা ছুটে এসে তান্ত্রিকের পায়ে লুটিয়ে পড়ে, সেই দলই পয়েন্ট পায় বা বিজয়ী হয়। অন্যদলের তান্ত্রিকরা আবার পাল্টা মন্ত্র বা ‘বান’ ছুঁড়ে পাতা-কে আটকে রাখার চেষ্টা করেন।
তান্ত্রিকদের দাবি : ‘এ তো মন্ত্রের যুদ্ধ’-
খেলায় অংশ নেওয়া গাইবান্ধার কুপতলার প্রবীণ তান্ত্রিক আবুল কালাম বলেন, “এটা কোনো সাধারণ ভেলকি নয়। এটা গুরুমুখী বিদ্যা আর মন্ত্রের জোর। পাতা যখন মাঠে নামে, আমরা আমাদের সাধনার শক্তি দিয়ে তাকে আকর্ষণ করি। কার মন্ত্রে কত ধার, তা এই মাঠেই প্রমাণ হয়ে যায়।”
আরেক ওঝা মফিজুল মিঞার দাবি, “যদি মন্ত্র ভুল হয়, তবে পাতা আপনার দিকে আসবে না। উল্টে অন্য তান্ত্রিকের বাণে পাতার ক্ষতি হতে পারে, তাই আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়।”
দর্শকদের বিনোদন ও মুগ্ধতা-
গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এই খেলা এক টানটান উত্তেজনার বিনোদন। খেলার দর্শনার্থী কুলসুম বেগম বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই খেলার কথা শুনে আসছি। তান্ত্রিকদের ইশারায় জলজ্যান্ত মানুষ কীভাবে অবশ হয়ে ছুটে যায়, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এটা যেমন ভয়ের, তেমনই দারুণ আনন্দের।”
গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ জানান, “স্মার্টফোনের যুগে গ্রামবাংলার এসব আদিম সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে নির্মল বিনোদন দিতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের পুরোনো ঐতিহ্যকে তুলে ধরতেই আজও গ্রামবাংলায় জমে ওঠে শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী খেলা।”
বিজ্ঞান কী বলে? মন্ত্র নাকি কৌশল?
বিষয়টি নিয়ে যখন তুমুল বিতর্ক, তখন সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং বিজ্ঞানমনস্ক মহলের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, “এর পেছনে কোনো অলৌকিক কালো জাদু বা ভূত-প্রেতের শক্তি নেই। এটি আসলে এক ধরণের ‘ম্যাস হিপনোটিজম’ বা গণ-সম্মোহন এবং তীব্র মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। ঢোলের তালি, ধূপের গন্ধ এবং মন্ত্রের একটানা আওয়াজে মাঠের মাঝে থাকা ‘পাতা’রা এক ধরণের ঘোরের (Trance) মধ্যে চলে যায়। তারা মানসিকভাবে বিশ্বাস করে যে তারা মন্ত্রের দ্বারা চালিত হচ্ছে, আর সেই বিশ্বাসের বশেই তারা তান্ত্রিকদের দিকে ছুটে যায়। এটি পুরোপুরি মনস্তাত্ত্বিক ইলিউশন এবং শারীরিক কৌশলের খেলা।”
মন্ত্র কিংবা বিজ্ঞান—বিতর্ক যাই হোক না কেন, যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে গ্রামীণ জনপদে হাজার হাজার মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং এক সুতোয় সবাইকে বেঁধে রাখার ক্ষেত্রে এই ‘পাতা খেলা’ আজও অনন্য এক বিনোদনের মাধ্যম। গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এই অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি বছরই এমন সুস্থ বিনোদনের আয়োজন করা উচিত বলে মনে করেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com