বন্ধু’ ছোট্ট একটি শব্দ- এই ‘বন্ধু’ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কতো ছড়া, কতো কবিতা, কতো গল্প, কতো উপন্যাস-উপাখ্যান, কতো গান রচিত হয়েছে যা পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় বা সাহিত্যে রচিত হয়নি। ‘বন্ধু’ কি শুধু একটি শব্দ? ‘বন্ধু’ বা ‘বন্ধুরে…’ এই প্রিয় শব্দ বা শ্রুতিমধুর ডাকের মধ্যে কতো আন্তরিকতা রয়েছে সেটা অনুভবের বিষয়, ভাষায় বুঝানো সম্ভব নয়।

এই বন্ধুত্ব কোনো নিক্তি দিয়ে মাপা সম্ভব নয় বা কোনো বইয়ের সংজ্ঞা দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়। এই সুন্দর মায়াবী পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্পাপ সম্পর্কের নাম ‘বন্ধুত্ব’- এই ‘বন্ধু’ শব্দের মাঝে মিশে আছে যেন অত্যন্ত নির্ভরতা আর আন্তরিক বিশ্বাস। বন্ধুত্ব হলো হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ানো ভালোবাসা এবং মন খুলে অব্যক্ত সুপ্ত জমানো কথা বলা।
এ যেন রক্তের সম্পর্কের চেয়েও শক্তিশালী কোনো বাঁধন। বন্ধুকে ভালোবাসা দিয়ে বা আদর সোহাগ করে কতো কতো নামে ডাকা হয়, সখা, সখী(বান্ধবী), সই, প্রিয়া আরও অনেক নামে। নজরুল সংগীতে আছে- “সই ভালো করে বিনোদ বেণী বাঁধিয়া দে”। কবি’রা সখী(বান্ধবী) বা প্রিয়াকে নিয়ে কতো কিছু কল্পনা করে মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়ে তুলেন।
কবি নজরুল ঠিক এভাবেই তাঁর প্রিয়াকে সাজিয়েছেন যা অতুলনীয়। পৃথিবীর আর কোনো কবি কি পারবেন তার প্রিয়াকে এভাবে সাজাতে? “মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল। কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির, চৈতী চাদের দুল।………….. গ্রামবাংলায় মহিলাদের মধ্যে সই পাতা নিয়ে এখনো ঘটা করে কতো অনুষ্ঠান হয়।
যেটা বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে আছে কি? রবীন্দ্রসংগীতে সখীকে এভাবেই বলা হয়েছে- “ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে।” এই বন্ধু, সখা, সখী(বান্ধবী) ও সই নিয়ে বাংলা গান ও কবিতার উদাহরণ দিতে গেলে স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়, এটা মহাকাব্যকে ছাড়িয়ে যাবে। গ্রাম-বাংলার কবি জসীমউদদীন আহমেদ ‘আমার বাড়ি’ কবিতায় বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন।
বন্ধু আসবে বন্ধুর বাড়িতে এর জন্য বাড়িতে সাদাসিধে আয়োজন অথচ এর মধ্যে যে কতো আন্তরিকতা রয়েছে তা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতির মধ্যে আছে কি? তাই বাঙালি বন্ধুত্বের তুলনাই হয় না। বাঙালি বন্ধুর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা চিরন্তন ও শাশ্বত। তাই এ ‘বন্ধু’ শব্দটির ব্যাপকতা ও ভালোবাসার বিশালতা অল্প কথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
গ্রামবাংলায় মহিলাদের মধ্যে সই পাতা নিয়ে এখনো ঘটা করে কতো অনুষ্ঠান হয়। যেটা বাঙালি ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে আছে কি? বন্ধুত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে ভালোবাসা। মানুষ সামাজিক জীব। বন্ধু ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। বন্ধুত্বের স্বাদ অমলিন তাই বন্ধুহীন কোনো মানুষই সুখী হতে পারে না। যাদের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী বন্ধু তারা এক মুহূর্তের জন্যও মন থেকে আড়াল করতে পারেন না বন্ধুদের।
জীবনের সংকটে এরা মুহূর্তে ছুটে যান বন্ধুদের কাছে। বাঙালির বন্ধুত্বের বৈশিষ্ট্যই আলাদা। বাঙালি বন্ধুর হাত ধরেই বড় হয়, একসঙ্গে ভালোবাসা শেখে, সংগ্রামের বজ্রকঠিন শপথ নেয়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও লিখেছেন- ‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও ভুলো না তারে ডেকে নিতে তুমি………।
গানটি যেন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জীবনের চলার পথে জীবনের টানেই বন্ধুর পাশে থাকা, তাকে চিনে নেয়া বড্ড প্রয়োজন। কেননা আমরা বলে থাকি বিপদের বন্ধুই বড় বন্ধু। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বড় মধুর। আমাদের শিল্প সাহিত্যে ও সংগীতে বন্ধুত্বের সেই নিদর্শন দেখি।
এ বন্ধন চিরন্তন, শাশ্বত, সার্বজনীন। যা বলার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা এক ধরনের স্বস্তি খুঁজে পাই। বয়স-সময়-স্থান সব ছাপিয়ে এই শব্দটি আমাদের একাকার করে দেয়। শব্দটি যেন খুব কাছের। অন্যরকম অনুভুতিমাখা।