গাইবান্ধার সন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুরের প্রমত্তা তিস্তার কোল ঘেষে জমাদারের চর। এই চরে এক সময়ে ছিল বসত ভিটা, ছিল আবাদী জমি। জমির ফসলেই পরিবার পরিজন নিয়ে সুখেই দিন কাটত সৈয়দ আলীর। তবে সুখ কখনো চিরস্থায়ী নয়। নবাব সিরাজুদ্দৌলা নামক যাত্রাপালায় শোনা যায়, সকাল বেলা আমীর রে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা। জীবনটা সত্যিই তাই। সুখ-দুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন।
স্বাধীনতার আগে ৮ ও ৬ বছরের ছোট দুই সন্তান রেখে পরপারে পাড়ি জমান সৈয়দ আলী। তার অনুপস্থিতিতে সংসারে নেমে আসে দারিদ্র্যতার কষাঘাত। থমকে যায় জীবন নামের তরী। দুই সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন স্ত্রী আমিরন বেওয়া। কি আর করার, রেখে যাওয়া জমি আমিরন বেওয়ার ভাসুর ও দেবর চাষাবাদ করে কয়েক মন ধান দিত। তা দিয়ে কোনরকমে চলত সংসার।
সময়টা ছিল আশির দশকের মধ্যভাগ। এ সময় আমিরন বেওয়ার বসত ভিটা আবাদী জমি কেড়ে নেয় সর্বনাশা প্রমত্তা তিস্তা নদী। এরই মধ্যে ছেলেও চলে যান পরপারে। এখান থেকে নিঃস্ব হয়ে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে চলে আসেন পাশের গ্রাম পুঁটিমারিতে। ঠাঁই হয় অন্যের বাড়িতে।
এরপর, নব্বই দশকের শেষভাগে শান্ত হয় তিস্তা। জেগে ওঠে চর। এ চর দেখে আনন্দে মন ভরে উঠে আমিরন বেওয়ার। সুখের স্বপ্ন দেখেন। বুক ভরা আশা নিয়ে ফেরার চেষ্টা নেন স্বামীর বসত ভিটায়।
এবার নদী নয়, বাঁধ সেধে বসেন তারই ভাসুর ও দেবর। জমি দূরের কথা। তাদের দাপটের মুখে অসহায় হয়ে পড়েন আমিরন বেওয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার এক পর্যায়ে ভাসুর, দেবরের মৃত্যুর পর তাদের ছেলেরা দখলে নেন বৃদ্ধা আমিরন বেওয়ার শেষ সম্বল বসত ভিটাসহ আবাদী জমি। সেই সাথে দখল নেন বৃদ্ধা আমিরন বেওয়ার মেয়ে জামাইয়ের কেনা ১৮ শতক জমিও।
নিজের জমি থাকলেও আহার জোটেনা আমিরন বেওয়ার। বিভীষিকাময় জীবন নিয়ে এখন দিন কাটতে হচ্ছে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে। বছর দু’য়েক আগে থানায় এক বৈঠকে জমিজমা ও ভিটেমাটি ছেড়ে দেয়ার অঙ্গীকার করলেও পরবর্তীতে এ অঙ্গীকারও রক্ষা করেনি
দখলবাজ প্রভাবশালী ভাতিজারা।
বৃদ্ধা জীবনের শেষ সন্ধিক্ষণে আমিরন বেওয়া বয়সের ভারে এখন নুইয়ে পড়েছেন। আর পারছেন না পেরে উঠতে। তবু চুপে চুপে দেখতে যান সেই বেদখলে যাওয়া বসত ভিটা আর ফসলি জমি। এসব দেখে নিরবে নিভৃতে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফিরে আসেন আপন ঠিকানায়।
বৃদ্ধা আমিরন বেওয়া বলেন, জমিতে গেলেই ভাতিজারা মারধর করে এমনকি গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। ভাতিজারা বলে, আমার জমির ফসল বিক্রি করে আমার বিরুদ্ধে মামলা চালাবে। মামলার গ্যাড়াকলে ফেলে মেয়ে, জামাই, নাতি ও নাতির ছেলেদের হয়রানি করছে ওরা। জামাইকে মেরে কোমার ভেঙে দিয়েছে। তাই জমি উদ্ধারে ইউএনওর কাছে বিচার দিয়েছি।
বৃদ্ধার জমি জবরদখলে করার বিষয়ে জানতে চাইলে ভাতিজা আবদুল হাই বলেন, চাচি ও চাচাতো বোন, ফুফু আয়েশা জমি পান। ফুফুর জমি কেনার পর তাদের জমিও নেব। তাহলে চুরির মিথ্য মামলা দিয়েছেন কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি করিনি। বড় ভাই আবদুল হাকিম করেছে।বিষয়টি জানতে চাইলে তারাপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি মীমাংসার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পরে মারামারি ও মামলা হওয়ায় আর মীমাংসা হয়নি।
বৃদ্ধার অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজির হোসেন বলেন, এসিল্যান্ডকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এখতিয়ারভুক্ত বিষয় হলে বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বৃদ্ধা আমিরন বেওয়ার শেষ প্রত্যাশা, জীবনের শেষ মূহুর্তে হলেও স্বামীর রেখে যাওয়া বসত ভিটা আর আবাদী জমিটুকু দেখে যেতে চাই। মৃত্যুর পর করব যেন হয় স্বামীর ভিটায়।