একটি মানব শিশুর জন্ম। শুভ ক্ষণ, শুভ মুহুর্ত ও শুভ বার্তা। একটি রাষ্ট্রের, একটি সমাজের, একটি সম্প্রদায়ের, একটি পরিবারের এমনকি বিশেষ করে একজন মায়ের কাছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ এবং মধুর বার্তা নিয়ে আগমনকারী শিশুর আগমনের রাস্তায় বন্ধুর নয়, আমাদের তৈরি করতে হবে সহজ, সরল এবং আনন্দময়।

তারজন্য গর্ভ ধারণ করতে ইচ্ছুক মমতাময়ী মায়ের শারীরিক, মানসিক প্রস্তুতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি পরিবারের আর্থিক এবং সামাজিক প্রস্তুতি শিশুর আগমনের রাস্তাকে উপযোগী এবং স্বাবলীল করতে অতীব প্রয়োজন। আমরা একজন মায়ের গর্ভধারণের সংবাদ শুনেই মা-বাবা এবং পরিবারের আপনজন আনন্দে আপ্লুত হই। কিন্তু কখনো কখনো আমরা আগত শিশুর ভবিষ্যত স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক জীবন সুন্দর করতে ভুলে যাই।

একজন মায়ের সন্তান ধারণের ইচ্ছে পোষনের সাথে সাথে মায়ের যেমন শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সাথে সাথে বাবা’সহ পুরো পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার। বাহ্যিকভাবে সুষ্ঠ থাকা অবস্থায় আমরা কেউ কোন দিন শরীর সুস্থ আছে কি’না সেই উদ্দেশ্যে কোন ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করি না।

আমরা এখনও এই অভ্যাসে অভ্যস্থ হয়ে উঠতে পারিনি। একটি দাম্পত্য যখন সন্তান নিবেন বলে মনে মনে ইচ্ছে পোষণ করেন গর্ভ ধারণ পূর্ব সেবার উদ্দেশ্যে শারীরিক চেক-আপ করার জন্য একজন গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এর শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই গুুত্বপূর্ণ। কয়েকটি স্তর যেমন গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা, গর্ভকালীন সময় (০৬-১৪ সপ্তাহ, ২৪-২৮ সপ্তাহ, ৩২-৩৬ সপ্তাহে), সন্তান প্রসবের পর এবং সন্তান প্রসবের এক বছর পর এই সময়গুলোতে চিকিৎসা বা চেক আপ করানোর মাধ্যমে মায়ের ডায়াবেটিস প্রতিকার বা প্রতিরোধ’সহ অন্যান্য রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যেমন সম্ভব এবং অন্যদিকে আগত সন্তানের স্বাস্থ্য সু-স্বাস্থ্য হিসেবে গড়ে তুলতেও অন্যতম ভূমিকা রাখবে ।

রোগ নেই স্ত্রীর, স্বামীর হয়ত ভাবনা হতে পারে কেনইবা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন সেই সাথে বেশ কিছু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা। স্বামীর, স্বামীর পরিবারের বা সাধারণ জনগণ ভাবতে পারেন গর্ভ-ধারণ পূর্ব সেবাটি অর্থ অপচয় ছাড়া কিছুই না। আপাতত দৃষ্টিতে এমনটি মনে হতেই পারে।

কিন্তু আমরা গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবো টাকা অপচয় তো নই’ই, বরং যারা একদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসবে, এই সমাজের একজন সু-নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে, একটি পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং মা’য়ের কোলকে আলোকিত করবে এই অর্থ ব্যয়টি হলো তারজন্য শক্ত বীজ বপন করা। আমরা হয়ত এই পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করতে পারছি এবং হয়ত এখন স্বীকার করে নিবো একজন নারীর গর্ভ-পূর্ব সেবার জন্য গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এর শরণাপন্ন হওয়া যেমন প্রয়োজন রয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শক্রমে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করানোও অতীব প্রয়োজন। সেই সাথে সাথে আরও একটি প্রশ্নের উদয় হতে পারে, হয়ত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেই যথেষ্ট।

আমি একজন জনস্বাস্থ্যবিদ ও সমাজকর্মী হিসেবে বলবো, কখখোনই না। গর্ভ পূর্ব প্রস্তুতির অনেকগুলো প্রস্তুতির মধ্যে মায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করানোকে আমরা মাত্র একটি প্রস্তুতি বলতে পারি। শারীরিক প্রস্তুতি ছাড়াও গুরুত্বের সহিত যে বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হতে হবে সেটি হলো মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আর মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণটি শুধুমাত্র গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক মা গ্রহণ করবেন বিষয়টি তা নয়।

প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে স্বামীর, শ্বশুড়, মা-বাবা এমনকি পরিবারের অন্যান্য পুরো সদস্যদের। স্বামী হয়ত নিয়মিত পেশাগত প্রয়োজনে পরিবার ব্যতিত যে সময় ব্যয় করতেন, তা একান্ত প্রয়াজনীয় সময় ব্যতিত বাসায় চলে আসার অভ্যাস গড়ে তুলতে শুরু করা। ছোট খাটো কাজ যেগুলো স্ত্রীর দ্বারা করানো হতো, তা আস্তে আস্তে নিজে করতে হবে সেই ভাবনা নিজের মাঝে তৈরি করা। শ্বশুড়-শাশুড়ী ছেলের বৌয়ের কর্তৃক করিয়ে নেয়া কাজগুলো সম্ভব হলে আনন্দের সহিত নিজে করার অভ্যাসে পরিনত করতে হবে। তবে ছেলের বৌ যেন বুঝতে পারে, তাঁরা নিজে থেকেই ইচ্ছে করে আনন্দের সহিত কাজটি করছেন। অন্যথায় ছেলের বৌ অর্থাৎ গর্ভ ধারণ করতে ইচ্ছুক নারী মানসিক টেনশনে থাকবেন।

সন্তান ধারণ করতে ইচ্ছুক নারীর মা, বাবা, ভাই বোন ঐনারীর স্বামীর সাথে অধিক সুন্দর সম্পর্ক তৈরির সাথে সাথে স্বামীর বাড়ীর পরিবারের সদস্যদের সাথে আরও মজবুত সুন্দর সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক মায়ের মেডিকেল চেক আপ ছাড়াও নিজস্ব কৃষ্টি, কালচার এবং ধর্মীয় নৈতিকতামূলক কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। ভালো চিন্তা, ভালো ভাবনা এবং ভালো কর্মের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখা যেমন প্রয়োজন অন্যদিকে যে যে ধর্মেরই হউক না কেন নিজের ধর্মীয় রীতি নীতি অনুসরণ করা’সহ ধর্মীয় বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা অতীব প্রয়োজন।

গর্ভ ধারণ পূর্ব সেবায় একটি সুন্দর প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অন্যতম আর একটি প্রস্তুতি আর্থিক প্রস্তুতি। দ্রব্য মূল্য উর্ধ্বগতির জন্য বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবার প্রধান সংসার চালাতেই হিমছিম খেতে হয়। ঐসব পরিবারের প্রধানগণ শুরু থেকেই কিছু সঞ্চয় করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলে গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক নারীর আর্থিক অভাবে নিয়মানুযায়ী মেডিকেল চেক আপ করা থেকে বঞ্চিত হবেন না।

অন্যদিকে গর্ভধারণ করতে যাওয়া নারীর মেডিকেল চেক আপ বাবাদ অর্থ কোন পরিবারের উপর বোঝা মনে হবে না। বরং তখন গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক নারী’সহ পরিবারের পুরো সদস্যদের কাছে সন্তান ধারণ করার সংবাদটি হবে আনন্দের এবং আগত শিশুর অনাগত পথ হবে সহজ, সরল, সুন্দর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ।

লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম

কলামিস্ট,জনস্বাস্থ্যবিদ ও সমাজকর্মী

সভাপতি : এসো সচেতন হই সোসাইটি-এসই

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}