উত্তর জনপদের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার নদীর ৯৮৬টি চরে ৩ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের প্রায় ২ লাখ পরিবারের বসতভিটা বন্যাঝুঁকিতে রয়েছে। নদীভাঙনে বাড়ি-ঘর স্থানান্তর করে বিভিন্ন নিচু চর ও জমিতে ঘরবাড়ি তুলে কোনোমতে ঠাঁই নিলেও বন্যা আতঙ্কেই বসবাস করতে হচ্ছে। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যুমনার চরের ৭ জেলার ৩ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের মধ্যে প্রায় ২ লাখ পরিবার নিচু স্থানে বিভিন্ন চরে ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করছে। আর্থিক দৈন্যতায় মাটি কেটে বাড়িঘর উঁচু করার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বছরের পর বছর এসব পরিবার বন্যার সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবন যাপন করছেন।

এতে বন্যাকালীন এসব পরিবারের লোকজন পানিবন্দী অবস্থায় জীবন যাপন করেন। নদনদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গেই ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুপ্রাণী নিয়ে বিভিন্নস্থানে সাময়িক আশ্রয় নেন। সাঘাটা উপজেলার কুমারপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিল প্রামাণিক জানান, চার বছর ধরে অন্যের জমিতে ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করছি। বাড়িঘর বন্যামুক্ত করতে অনেক টাকার মাটি কাটতে হয়। এত টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য না থাকায় বছরের ৩ মাস বন্যার পানিতে বাড়িঘর ডুবে থাকে। ফুলছড়ি উপজেলার পিপুলিয়া গ্রামের নুর ইসলাম জানান, নদীভাঙনে কয়েক পরপর বাড়িঘর টানাটানি করতে হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে বাড়িঘর মাটি কেটে উঁচু করার সাধ্য থাকে না। এ কারণে বন্যা আতঙ্কে সময় পার করতে হয়। ফুলছড়ি উজালডাঙ্গা গ্রামের ময়নাল ব্যাপারী জানান, নিচু জমিতে ঘর থাকায় ২০২৪ সালের বন্যায় একটি ঘর বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে। এবারও আতঙ্কে আছি।

ফলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ মিয়া বলেন, সরকার কিছু কিছু এলাকার আশ্রয় কেন্দ্র করেছে, তবে সেখানে প্রকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয় মেলে না। আবার যেখানে করেছে তা সুবিধাজনক স্থানে না হওয়ায় লোকজন ঘরবাড়ি নিলেও সেখানে থাকছে না। ফজলুপুর ইউনিয়নের গুপ্তমনি চরের মঞ্জু মিয়া বলেন, সরকার করছে কয়েকটি পরিবারের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র, আর চরে আছে হাজার হাজার পরিবার। তিনি অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, চরের জন্য প্রয়োজন বসতভিটা উঁচু করা। কেননা নিজেদের ঘরবাড়ি ও জমিজমাতে যদি বসতভিটা উঁচু করার ব্যবস্থা করতো তাহলে আত্মীয় স্বজন নিয়ে মিলে মিশে নিরাপদে থাকা যেত। চর গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রধান নির্বাহী এম, আবদুস সালাম জানান, চরের মানুষ সংঘবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করেন। কেননা বন্যাকালীন আপদ-বিপদে চরের মানুষ একে অন্যকে সহায়তা করে।

এজন্য বাড়িভিত্তিক বসতভিটা উঁচু করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, চরের মানুষকে ক্লাস্টারভিত্তিক মাটি কেটে বন্যা মুক্ত করতে পারলে তারা সারা বছর নিরাপদে থাকতে পারবে। এজনা তিনি জিইউকের উদ্যোগে ক্লাস্টার ভিলেজ স্থাপনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জানান, চরের মানুষের বসবাসের জন্য তাদের মতো করে বসততি গড়ে তুলতে সহায়তা করতে হবে। কেননা চরের মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে একসঙ্গে থাকতে চান। এজন্য তিনি চরের নিচুস্থানে অবস্থান নেয়া বসতবাড়ি মাটি কেটে উঁচু করা এবং ক্লাস্টারভিত্তিক বসতি উঁচু করার বিষয়ে যৌক্তিক অভিমত ব্যক্ত করেন। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ জানান, বন্যা বা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে কোনো মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়- এজন্য বর্তমান অত্যন্ত সহনশীল। তিনি আরও বলেন, চরের মানুষের প্রয়োজনীয় যাচাই সাপেক্ষে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে পরিকলল্পনা নেয়া হচ্ছে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}