গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদ-নদী বেষ্টিত চার’টি উপজেলার দূর্গম চরাঞ্চলের বালুতে ভূট্টা চাষ করে চরের জনগোষ্ঠীর গতি ফিরছে অর্থনৈতিক বিপ্লবে।

চরাঞ্চলগুলো ঘুরে দেখা যায়, ভূট্টার কলা ছিঁড়ার কাজে দিনমজুররা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাঠফাঁটা রোদ অপেক্ষা করে তারা যেন ব্যস্ততায় সময় কাটছে। এ কাজে নারী শ্রমিকদের সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কর্ম-যজ্ঞের সুযোগ।

গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলের দৃশ্যপট অর্থনৈতিক সবুজ বিপ্লবে পাল্টে দিয়েছে অর্থকরি ভূট্টা চাষাবাদের সম্ভাবনার দুয়ার।

কামারজানী বন্দরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. সোলাইমান ইসলাম মাষ্টার বলেন, চলতি এই মৌসুমে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের পহেলা সপ্তাহেও ১৩’শ থেকে সাড়ে ১২’শ টাকা ভূট্টার মন ছিল কিন্তু বাজারে এখন প্রতিমন ভূট্টা ১১’শ এর নিচে ১,০০০ এ নেমে এসেছে। তবে আমদানি বেশি হওয়ায় ফিড কোম্পানিগুলো দাম কমিয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের নিকট থেকে উৎপাদন খরচের বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে জানান, প্রতি একর জমিতে ভূট্টা চাষাবাদ খরচ ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা কিন্তু ভূট্টা আসে ১১০ মন থেকে ১১৫ মন।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালকের দপ্তর সূত্র বলছে, চলতি এই মৌসুমে গাইবান্ধা জেলায় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭’শ ৫০জন কৃষকের হাতে ১৭ হাজার ৫৮৯ হেক্টর জমিতে ভূট্রা চাষ হয়েছে যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩’শ ৭০ মেট্রিক টন।

কিন্তু সরকারি কৃষি দপ্তরের পরিসংখ্যানের দ্বিগুণ ভূমিতে ভূট্টা চাষ হয়েছে বলেও অনেক কৃষক দাবি করেছেন।

উত্তর জনপদ বড় বাণিজ্যিক বন্দর কামারজানী। এ বন্দরে চরাঞ্চল থেকে আসা দৈনন্দিন শত শত  ভূট্টা বোঝাই নৌকা নৌ-ঘাটে ভীড়ছে এবং সরাসরি তা ট্রাক বোঝাই হয়ে দেশের বিভিন্ন ফিড কোম্পানিসহ খাদ্য দ্রব্যের কারখানায় যাচ্ছে।  দৈনিক ৩-৪’শ ট্রাকে করে ভূট্টা বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভাল মুনাফা অর্জন করতে পারছেন। মৌসুমের ৪ মাস ধরে চরাঞ্চলের ভূট্টার ব্যবসায় ব্যস্ততম বন্দর নগরী হিসাবে ২৪ ঘণ্টা ভূট্টার ট্রাক লোড চলে।

এদিকে ভূট্টার লাভে হাজার হাজার পরিবার দু-চারটা করে গাভী প্রতি মৌসুমে কিনতে পারছে। ফলে গাভী ও ভূট্টার দুটো দিকেই আয়ের একটি বড় ক্ষেত্র তৈরী হওয়ায় চরাঞ্চলে অর্থবিত্তে গরীব-ধনীর বৈষম্য কমতে শুরু করেছে।

কামারজানী বন্দরের ভূট্টা ব্যবসায়ী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, গমের আবাদের বিকল্প হিসাবে ভূট্টার চাষে অভাবনীয় সাফল্য চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছে। ভূট্টার চাষে ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে হাজার হাজার নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবার। তাদের ঘরে ৫ এর অধিক গাভী আছে যা ভূট্টা চাষের লাভের অংশে কেনা।

সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটি বোচাগাড়ী চরের মোছা: আলেমা বেগম বলেন, ঘরের গেরস্ত ক্ষেতে গিয়ে কামলা সাথে কাম করতেছে। পোলা-মাইয়াদের নিয়া আমি ভূট্টা মাড়াই করছি। ঝড়-তুফানে পাতারোত ক্ষেতের ভূট্টা পড়ে আছে। কামলা সময় মতো পাওয়া যায় না।

গাইবান্ধা সদরের কামারজানী ইউনিয়নের খামার কামারজানী চরের বিদেশ ফেরত মো. বেল্লাল হোসেন বলেন, আমি বিদেশ যাওয়ার জন্য দালালের খপ্পরে পড়ে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা প্রতারনায় ক্ষতিগ্রস্ত হই। বিদেশে গিয়ে কাজ করতে পারি নাই, দেড় মাসের ব্যবধানে ফিরে এসে উচ্চ মুনাফায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ২৫ একরের মতো ভূট্টার ক্ষেত লাগাই। ক্ষেতের ভূট্টা মাড়াই করে সকলের দেনা পরিশোধ করেছি এবং বিদেশ যেতে যত ধার দেনা ছিল তা কিছু কমিয়ে এনেছি। ভূট্রা চাষে শ্রম দিতে পারলে লাভ হবে।

গাইবান্ধা সদরের মোল্লারচর ইউনিয়নের বাজে চিথুলিয়া গ্রামের আফছার আলী দেওয়ানি বলেন, পোলারা সবটি মিলে এবার ৩০-৩৫ একরের মতো ভূট্টা লাগিয়েছি। অর্ধেক ক্ষেতে এখনো ভূট্টা ছিড়ে নেয়া হয়নি। তবে ঝড় ঝাপটায় ক্ষতির চিন্তা হচ্ছে। দেরিতে কিছু ভূট্টা লাগানোয় তা আসতে সময় লাগবে। তবে আমাদের চরাঞ্চলের মানুষদের স্বচ্ছলতা ভূট্টা চাষে হয়েছে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, দূর্গম চরাঞ্চলের পতিত জমিগুলো আবাদের আওতায় আসায় দেশে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় এই ভূট্টাচাষ অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সরাসরি ২ লক্ষাধিক কৃষক অর্থকরি ফসল ভূট্টা চাষে অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছলতায় এসেছে। আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা চরাঞ্চলের কৃষকদের চাষাবাদ সমস্যা সমাধানে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}