সম্প্রতি রাষ্ট্রপ্রধান ড. ইউনুস সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন—এই বক্তব্যে দেশব্যাপী একধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে টক শো পর্যন্ত কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও সুশীলদের একাংশ এতে ‘যুদ্ধোন্মাদনা’র গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা কেউ সরাসরি লিখে, কেউ ভিডিও বার্তায় বা আলোচনায় ড. ইউনুসের বক্তব্যের সমালোচনা করছেন—যেন তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলেছেন!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন রাষ্ট্রপ্রধান সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বললে তাতে সমস্যা কোথায়? এটি কি যুদ্ধ ঘোষণার সমান? নাকি এটি বরং একজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও দুরদর্শী নেতার স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত?
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
বর্তমান সময়ের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভারতের কিছু মিডিয়া ও কট্টর রাজনৈতিক গোষ্ঠী বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা ছড়াচ্ছে। সীমান্তে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, এবং ইতিহাস বলছে—সেখানে নিরীহ বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা, লাশ ফেরত না দেওয়া কিংবা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণে মিয়ানমারে চলছে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, যার ঢেউ পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে, সেনাবাহিনীকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে বলা কি অযৌক্তিক?
প্রতিরক্ষা এবং আগ্রাসনের বিভ্রান্তি
বুঝে না বুঝে অনেকেই ‘প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি’ আর ‘যুদ্ধ ঘোষণা’—এই দুটি ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি একটি রাষ্ট্রের অধিকার এবং দায়িত্ব। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নীতি। একজন নাগরিক যেমন নিজের ঘর রক্ষায় আগাম ব্যবস্থা নেন, তেমনি একটি রাষ্ট্রও সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখে তার বাহিনীকে প্রস্তুত রাখে। এটি শান্তির জন্যই একটি কৌশল।
সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি: মনোবলের ভিত্তি
আমাদের সেনাবাহিনী কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতিসংঘ মিশন, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সামষ্টিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেনাবাহিনীকে সচল ও প্রস্তুত রাখার নির্দেশ একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ড. ইউনুস সেই দায়িত্বই পালন করেছেন। তাঁর বক্তব্য সাধারণ মানুষের মাঝে আশ্বাস ও সাহস তৈরি করেছে—যা একটি দেশের জন্য অপরিহার্য মনোবল।
ইতিহাসের শিক্ষা
বাংলাদেশ ইতিহাসের ভেতর দিয়ে শিক্ষা নিয়েছে—প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সদিচ্ছা সবসময় একমুখী হয় না। অতীতে একতরফা হামলা, সীমান্ত লঙ্ঘন, বা জলসীমা নিয়ে বাড়াবাড়ির উদাহরণ রয়েছে। তবে এবার ব্যতিক্রম দৃশ্য দেখা গেছে—আমাদের সেনাবাহিনীর কঠোর প্রতিরোধের মুখে প্রতিপক্ষ সীমান্তরক্ষী প্রাণভিক্ষা করেছে। সেই দৃশ্য গোটা বিশ্বে ভাইরাল হয়েছে, আর এটি বুঝিয়ে দিয়েছ বাংলাদেশ আর আগের মতো অসহায় নেই।
ড. ইউনুস যুদ্ধ চাননি, বরং শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুতির কথা বলেছেন। এটি দুরদর্শী কূটনীতি ও আত্মরক্ষার প্রতিফলন। এ দেশের শান্তিকামী মানুষ কোনো আগ্রাসন চায় না, তবে আত্মসম্মান রক্ষায় পিছপা হওয়ার সুযোগও নেই। তাই তাঁর বক্তব্যকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা আদর্শিক চশমায় না দেখে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করাই যুক্তিযুক্ত
******—-***————-******
– লেখক, কলামিস্ট বিশ্লেষক এবং চিকিতসক