একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রূপ লাভ করে, যখন তার প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সেই অধিকার প্রয়োগের উপযুক্ত সুযোগ পায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—এটি নাগরিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিক অধিকার: এক বিমূর্ত ধারণা হয়ে আছে বাংলাদেশে “নাগরিক অধিকার” কথাটি অধিকাংশ মানুষের কাছে শুধুই একটি পাঠ্যবইয়ের পরিভাষা। অথচ এটি শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়—এটি প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। একজন নাগরিক রাষ্ট্রকে কর দেন, শ্রম দেন, মেধা দেন। তিনি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে অবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যান। অথচ সেই নাগরিকই জানেন না—তিনি রাষ্ট্রের কাছে কী দাবি করতে পারেন, তাঁর নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার কতটুকু নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমাদের পাঠ্যসূচিতে সংবিধান, আইন, মৌলিক অধিকার বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে সামান্য কিছু তথ্য দেওয়া হলেও, তা এতটাই রূপকভাবে উপস্থাপিত হয় যে শিক্ষার্থীরা তা অনুভব করতে শেখে না।

শিক্ষাব্যবস্থার এই শূন্যতার কারণে দেশের বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষই নাগরিক সচেতনতা থেকে বঞ্চিত থাকে। বঞ্চনার বাস্তব চিত্র আমরা প্রায়ই দেখি—একজন সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য বা প্রশাসনিক কর্মচারী একজন সাধারণ নাগরিককে অসম্মানজনকভাবে আচরণ করছে। এক সচিব যদি শুধুমাত্র “স্যার” না বলায় একজন নাগরিককে তিরস্কার করেন, কিংবা একজন পিয়ন যদি পরিষেবা না দিয়ে অহংকার প্রদর্শন করেন—তবে তা স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহারের পরিচায়ক। এই ধরনের অপব্যবহার সম্ভব হচ্ছে মূলত এজন্য যে, নাগরিকরা জানেন না তারা কেমন আচরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। সংবিধান স্পষ্টভাবে বলেছে—প্রজাতন্ত্রের মালিক তার জনগণ, অর্থাৎ বৈধ নাগরিকগণ। সরকারি কর্মকর্তারা হচ্ছেন সেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, সেবক—not masters but servants of the people।

আইনগত অধিকার: আমাদের অজানা বাস্তবতা অনেকেই জানেন না, পুলিশ যদি কাউকে গ্রেফতার করে, তাহলে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে তোলা বাধ্যতামূলক। আদালতের অনুমতি ছাড়া রাতে কাউকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া বেআইনি। অথচ এই ধরনের ঘটনাই আমাদের সমাজে বারবার ঘটে যাচ্ছে। একে তো আইন জানি না, তার ওপর জানার সুযোগও দেওয়া হয় না। ফলে প্রশাসন, পুলিশ বা রাজনীতিকরা নির্বিঘ্নে এই অজ্ঞতাকে পুঁজি করে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য কোথায় হারাল? শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো—মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও নাগরিক চেতনা গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ, আইনগত জ্ঞান ও অধিকারবোধ গড়ে উঠছে না। শিক্ষার্থীরা বড়জোর জানে কিভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হয়, কিন্তু তারা জানে না কিভাবে একজন সচেতন ও সম্মানিত নাগরিক হয়ে উঠতে হয়। নাগরিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হোক বাধ্যতামূলকভাবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো নাগরিক অধিকার ও সংবিধানভিত্তিক শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। বিষয়গুলো হতে হবে প্রাসঙ্গিক, বাস্তব উদাহরণভিত্তিক এবং জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

“সিটিজেনশিপ এডুকেশন” নামে একটি স্বাধীন বিষয় চালু করা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকের অধিকার, দায়িত্ব, আইনি সহায়তা, প্রশাসনিক কাঠামো, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, এবং সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো শেখানো হবে। শিক্ষা হোক ক্ষমতায়নের হাতিয়ার শিক্ষা কেবলমাত্র ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি হতে হবে আত্মসচেতনতা ও ক্ষমতায়নের পথ। নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে জানানো, আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, আইনি পথ জানিয়ে দেওয়া—এসবই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব। যখন একজন নাগরিক জানবেন কী তার অধিকার, তখনই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবেন।

তখনই প্রশাসন ও শাসক শ্রেণি জবাবদিহির মধ্যে আসবে যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অধিকার শেখায় না, সে রাষ্ট্র একদিন নাগরিকদের কাছেই অবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশকে একটি মানবিক, ন্যায্য এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষার ভিতকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। নাগরিক অধিকার শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। কেবলমাত্র তখনই আমরা এক সম্ভাবনাময় ও সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক দায়িত্ব ও মর্যাদার ভিত্তিতে গঠিত।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}