বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, ড. ইউনুস পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, কিন্তু বাতাসে গুঞ্জন স্পষ্ট। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একটি প্রশ্ন এখন জাতির সামনে—এটা কি অনিবার্য পরিণতি, নাকি সুযোগ হাতছাড়া করার একটি নির্মম উদাহরণ?

ড. ইউনুস জীবন সায়াহ্নে এসে এই রাষ্ট্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, যেখানে সংবিধানিক কাঠামো না থাকলেও ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ এবং জনগণের নীরব সমর্থন তাঁকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছিল। কিন্তু সেই বৈধতা টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা প্রয়োজন ছিল, তিনি তা করতে পারেননি।

শুরু থেকেই তার মন্ত্রিসভা ছিল নেতৃত্বের অভাবগ্রস্ত। কিছু বয়স্ক অসুস্থ , কর্মহীন সিনিয়র সিটিজেন, যাদের মাঝে কেউ কেউ স্বাস্থ্যগতভাবে অক্ষম এবং ডায়াপার চেঞ্জ করতে হয় । আর অন্যদিকে, কিছু অপটু তরুণ যাদের অভিজ্ঞতার চেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বড়। দুর্নীতির গন্ধ তাদের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর ক্যাম্পাস ঘেঁষা মানসিকতা দিয়ে তাঁরা রাষ্ট্র চালাতে চেয়েছেন।

ড. ইউনুস ভুল করেছেন—তিনি ভেবেছেন, ভালো মানুষ মানেই ভালো প্রশাসক। ভেবেছেন, NGO মডেলেই রাষ্ট্র চলবে। কিন্তু রাষ্ট্র NGO নয়। রাষ্ট্র চালাতে হয় রাষ্ট্রনীতিতে, যার কেন্দ্রে থাকে বাস্তবতা, কঠোর সিদ্ধান্ত, এবং শৃঙ্খলা।

নারী অধিকার, বার্মা সীমান্ত, এলজিবিটিভি ইস্যু—এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন বাজার অস্থির, সীমান্ত উত্তপ্ত, প্রশাসন অকার্যকর এবং সেনাবাহিনী নিঃসাড়, তখন এই ইস্যুগুলোতে অতিরিক্ত সময় দেওয়া যেন ঘরের আগুন রেখে পরিপাটি পর্দার চিন্তা করার মতো।

আরও বড় ভুল ছিল—প্রচারযুদ্ধে আত্মসমর্পণ। পাশের দেশের গণমাধ্যম যখন প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চালিয়েছে, তখন আমাদের পক্ষ থেকে ছিল নিরবতা, বিভ্রান্তি এবং প্রচারণার দুর্বলতা। জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরির জায়গায় তিনি তৈরি করেছেন সংশয়।

সবচেয়ে বড় কথা—তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর কোনো হোমওয়ার্ক ছিল না। ছিল না সুসংগঠিত পরিকল্পনা। একজন উঁচুমানের বক্তা ছিলেন, কিন্তু ব্যুরোক্রেটিক রণনীতি তাঁর আয়ত্তে ছিল না।

তবুও, সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। যদি তিনি সিদ্ধান্ত বদলান, তবে প্রথম কাজ হবে—এই অদক্ষ, সুবিধাভোগী পর্ষদকে সরিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা এবং প্রশাসন পুনর্গঠন। তৃতীয়ত, জুলাই বিপ্লবের আহতদের পূর্ণ চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা পালন।

তিনি যদি থাকেন, তাহলে দেশের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আর যদি চলে যান, তাহলে ইতিহাস তাকে মূল্যায়ন করবে—একজন সম্ভাবনাময় নেতার ব্যর্থ অভিযাত্রা হিসেবে।

শেষ পর্যন্ত, হয় নেতৃত্ব নিতে হবে, নয় ইতিহাসের পাতায় নিঃশব্দ বিদায় নিতে হবে।

“আমার বলার কিছু ছিল না
চেয়ে চেয়ে দেখলাম
তুমি চলে গেলে

—- লেখক একজন চিকিতসক কলামিস্ট এবং বিশ্লেষক

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}