ব্যর্থ সমাজের বারো বলির পাঁঠা (যত গর্জায়, তত বর্ষায় না – তবে মাথায় ছাতা রাখতেই হয়) একটা সমাজ ব্যর্থ কি না, তা বোঝার জন্য গুণফল, যোগফল, ব্যঞ্জক বা সরলীকরণ জানার দরকার নেই। চাই শুধু দুই চোখ খোলা রাখা, আর খানিকটা গালচোখে ভাবার ক্ষমতা। যেমন ধরুন, যদি দেখেন আপনার পাশের ভদ্রলোক চা খাওয়ার সময় ‘কোয়ান্টাম থিওরি’ নয়, বরং কোন নায়িকা কবে চুল কাটালেন তা নিয়ে ব্যস্ত, তবে বলাই বাহুল্য—সমাজ বেহুশে চলেছে।

প্রথম লক্ষণ: মানুষ বইয়ের পাতায় নয়, হুজুগের পিঠে চড়ে জাগে। বই মানে পোকা খাবে, চিন্তা মানে মাথা ধরবে—এই ভাবনা চলে। ‘মুক্তচিন্তা’ বললেই অনেকে ভাবে নিশ্চয়ই সিজার স্যালাডের নতুন কোনো ড্রেসিং!

দ্বিতীয় লক্ষণ: বিনোদন চাই, তবে যেন কচুরিপানার মতো হালকা আর সর্বত্র ছড়ানো যায়। এমনকি কেউ যদি হেঁচকি তুলেও ইউটিউবে আপলোড করে, তাহলেও ‘ভিউ’ কোটির ঘরে যায়।

তৃতীয় লক্ষণ: সমাজে সবচেয়ে সফল হলো সেই লোকটা, যার পাঁচতলা বাড়ি আছে অথচ উৎস খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় ‘খাস খতিয়ান নাই’। তিনি রোল মডেল—সৎ মানুষেরা রোল খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়।

চতুর্থ লক্ষণ: অশিক্ষিত কাকা বলেন, “তোর ছেলে এম.এ. পাশ? চাকরি তো আমার ভাগ্নের হয়! সে হাইস্কুলেই ডান বাম না দেখে সোজা দলভুক্ত হয়েছিল।”

পঞ্চম লক্ষণ: একজন ভাবুক মানুষ যদি মুখ খোলে, চারপাশ থেকে হাজার বোকার দল এসে বলে, “এইসব বইয়ের কথা কইয়া লাভ নাই, ভাই!” ফলত, সে আবার বইয়ের পাতায় ঢুকে যায়।

ষষ্ঠ লক্ষণ: যে চাকরি করে, তারে দেখে সবাই বলে, “বাপ রে বাপ! বড় হয়ে গেছে!” আর যে উদ্যোগ নিতে চায়, তাকে বলে, “তুই আগে একটা কিছু ‘ধর’, তারপর বাকি ভাবিস!”

সপ্তম লক্ষণ: সমাজে কেউ সত্যি কথা বললেই লোকে ভাবে, “ও নিশ্চয়ই কিছু চায়!” যেন সত্য বলাও একটা কু-অভ্যাস।

অষ্টম লক্ষণ: ছেলেপুলেরা বলে, “আইনি পথে টাকা আসে ধীরে, শর্টকাটেই ফাটকা!” তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মাত্র।

নবম লক্ষণ: সমাজ ব্যস্ত থাকে, ‘কে কাকে আনফলো করল’, ‘কে কবে কার জন্মদিনে উইশ করল না’ এসব বিষয় নিয়ে। পৃথিবীর উষ্ণায়ন কিংবা বেকারত্ব সেসব বড়ো অপ্রাসঙ্গিক!

দশম লক্ষণ: মানুষের মাথায় তত্ত্ব এমনভাবে গেঁথে যায় যে, ‘কেন মানুষ ভাত খায় না চিংড়ি চপ?’—এই প্রশ্নেই তারা রাত পার করে।

একাদশ লক্ষণ: বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ুক বা পতন ঘটুক, সবাইরই মতামত থাকে। সেই মতামত কিসের ভিত্তিতে? ফেসবুক কমেন্ট আর দোকানদারের হাঁ!

দ্বাদশ ও চূড়ান্ত লক্ষণ: সমস্যার গভীরে যাবার কথা বললেই লোকজন কেমন অস্বস্তিতে পড়ে যায়, যেন বলছেন—“চল, ডেন্টিস্টের কাছে যাই!” — এই হলো ব্যর্থ সমাজের বারো বলির পাঁঠা—যাদের দেখে আপনি হেসে উঠবেন, কিন্তু ভাববেনও। কারণ, আমরাও তাদের কেউ না কেউ। এখন আপনি যদি ভাবেন, “সব ঠিকই আছে”—তাহলে বুঝবেন, তালিকায় আপনার নাম ১৩ নম্বরে যুক্ত হতে চলেছে!

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}