একটি চুপচাপ একাকীত্বের গল্প মেয়েটার নাম নীলু হতে পারে। কিম্বা জয়িতা। তা নাম দিয়ে খুব একটা যায় আসে না। এরা সাধারণত ভালো ছাত্রী ছিল। ইংরেজি সাহিত্যে কিম্বা ফিজিক্সে অনার্স ফার্স্টক্লাস, । শখ ছিল বই পড়া, চা খাওয়া আর ছাদে হাঁটা। বন পাহাড় নয়ত সমুদ্রের পাড়ে ঘুরে বেড়ানো
একদিন হঠাৎ সে বলে উঠলো, “আমি তো নিজের মতো করে বাঁচিনি কখনো।”
স্বামী চুপচাপ খবরের কাগজে চোখ রাখে।
মেয়ে পাশের ঘরে হোমওয়ার্ক করছে।
ছেলেটা লুডু খেলছে।
ভাবে—এই সংসারটা আসলে তার জন্য না।
সে বেরিয়ে আসে। নিজের মতো করে বাঁচতে চায়।
ফ্ল্যাট নেয়, বেতনের টাকা দিয়ে পর্দা কেনে, কিচেনে কফির কেটলি বসায়।
তবে কিছুদিন পর কী হয় জানেন?
রাতের বেলা জানালায় কুয়াশা জমে। ফোনে কেউ খোঁজ নেয় না।
ইনস্টাগ্রামে ছবিতে লাইক পড়ে, কমেন্টে লেখা—”Queen!”
কিন্তু মেসেঞ্জারে শুধু বুস্টেড পেজের অফার।
এক সন্ধ্যায় সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে—
স্বামীটা কি খুব খারাপ ছিল?
তেমন কিছু মনে পড়ে না। শুধু মনে হয়, ওর চোখে একটা শ্রদ্ধা ছিল,
যেটা এখন কেউ দেয় না।
—
কিছু উপলব্ধি, খুব ধীরে ধীরে আসে…
১. স্বামীটা বোকা ছিল হয়তো, কিন্তু সহ্য করত।
এখনকার মানুষগুলো খুব ব্যস্ত, ছোট ছোট জিনিসেই ছেঁড়া হয়ে যায়।
২. নারীবাদ বইয়ে ভালো লাগে। নারী স্বাধীনতা গাল ভরা শব্দ।
ইন্টারনেট বাহবা দেয়, কিন্তু জ্বর হলে ওষুধ দেয় না কেউ।
কেউ কপালে ছোঁয়ায় না হাত।কিছু মতলব বাজ পুরুষ নারীবাদকে সমর্থন করে দিন শেষে নারীকেই বানাতে চায় কামনার বস্তু ভোগের পণ্য।
৩. আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এখন চোখে কালি দেখে।
যে চোখ একসময় বলত—“তুমি খুব সুন্দর”,
সে চোখ এখন কোথাও নেই।
৪. স্বাধীনতা চেয়েছিল। পেয়েছে।
তবে শান্তি চায় এখন।
যেটা তখন ছিল, কিন্তু বোঝেনি।
৫. সন্তানদের চোখে এখন দুই পৃথিবীর দুই মানচিত্র।
বাবা, যার কথা মা বলেন না।
আর মা, যিনি দিন শেষে কাঁদেন, নিঃশব্দে।
৬. “সিঙ্গেল মাদার”—শব্দটা হয়তো গর্বের,
কিন্তু স্কুলের গার্জিয়ান মিটিংয়ে সেটা বোঝে না কেউ।নীরবে হজম করে যেতে হয় অগনিতের তীর্যক দৃস্টি।
৭. ধনী জীবন?
দামী হ্যান্ডব্যাগ আছে, কিন্তু হাত ধরার মানুষ নেই।
৮. মনোযোগ অনেক পেয়েছে।
কিন্তু ভালোবাসা?
সেটা ছিল সেই চুপচাপ স্বামীর চায়ের কাপের মধ্যে।
৯. শান্তি?
এখনো কল্পনায় আছে।
বাস্তবে আসে না।
১০. যাদের কথা শুনে বেরিয়ে এসেছিল, তারা কেউ আর পাশে নেই।
ওরা এখন অন্য কাউকে বলছে—”তুমি কুইন!”
আর মিতা/রুনা জানে, সেই রাজ্য আসলে কাচের।
—
শেষে সে কাঁথা মুড়িয়ে চুপচাপ ঘুমায়।
রাত একটা বাজে। ঘরে নিঃশব্দ।
একটা শান্তি ছিল একসময়—
যেটা এখন শুধু পুরনো ছবির ক্যাপশনে বেঁচে আছে।
মানছি সব সিদ্ধান্ত ভুল হয় না। তবে সব ঠিকের মধ্যেও একটা হাহাকার কিন্তু লুকিয়ে থাকে।
সংসার যেমন বোঝা, তেমনি আশ্রয়ও।
আর ‘নিজের মতো বাঁচা’ মানে যদি হয় কেউ পাশে না থাকা—
তাহলে এক কাপ চায়ের বদলে, কেবল হাওয়া পাওয়া যায়।