সম্পর্ক’ এর ইতিবাচকরূপ ‘সু-সম্পর্ক’।‘সম্পর্ক’ বা ‘সু-সম্পর্ক’কে ঘিরে তৈরি হয়ে থাকে সুন্দর দৃঢ় একটি বন্ধ। হতে পারে স্বামী-স্ত্রী মধ্যে, প্রেমিক-প্রেমিকা, মা-বাবা, আত্মীয় বা পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্যদের মাঝে। কিন্তু আমরা হয়ত অনেকেই চিন্তাও করি না, আমাদের শরীরের কোন এক অর্গানে সমস্যা দেখা দেয়ায় আমরা হয়ে পড়ি অকেজো বা অসুস্থ। সেই অসুস্থ অর্গান বা শরীর সুস্থ করতে পুরো প্রসেস এর মাঝে কি ঐ কয়েক অক্ষরের ‘সু-সম্পর্ক’ শব্দটি কতটুকু গুরুত্ব বহন করে? না ‘এই ‘সু-সম্পর্ক’ শব্দটি শরীর সুস্থ হওয়ার পসেস এ অর্থহীন ? গ্লোবাইলাইজনের এই যুগে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা ব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর ও সংকটময় প্রেক্ষাপটে ‘সু-সম্পর্ক’ হয়ে উঠতে পারে আরোগ্যের এক মৌলিক স্তম্ভ।

আমি একজন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, মানবিক সেবা আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আজকের চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক, নার্স, রোগী এবং রোগীর স্বজনদের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই হল সফল আরোগ্যের মূল চাবিকাঠি। শুধুমাত্র ওষুধ সেবন বা প্রয়োজনে অপরেশনই নয়, এখানে একটি সুন্দর দায়িত্বশীল ‘সু-সম্পর্ক’ নির্ধারণ করে সেবার গুণগত মান। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা দাতা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহিতা এই দুই গ্রæপের মধ্যে কিভাবে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে কেন তা এত জরুরি। আজকে তা প্রশ্নের বিষয়ে পরিনত হয়েছে।

একজন রোগীর রোগের মাত্রা অনুযায়ী শরীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হোক বা রোগ নির্ণয়ের আলোচনা যখন রোগী অনুভব করে চিকিৎসক বা নার্স তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেন, তখনই গড়ে ওঠে আস্থা। এই আস্থা রোগীকে পরিষ্কারভাবে সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে অনুপ্রাণিত করে। যারফলে রোগ নির্ণয় বা সঠিক চিকিৎসা প্রদানে সহায়তাপূর্ণ একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে থাকে। ডায়াগনোসিস, ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া, পুনঃর্বাসন প্রক্রিয়া এসব বিষয়ে খোলামেলা তথ্য প্রদান রোগীর বা রোগীর এ্যাটেনন্ডেদের মাঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে। তাতে একদিকে রোগীর বা রোগীর এ্যাটেনন্ডেদের স্বস্ফূর্তা দেখা যায় আবার অন্যদিকে চিকিৎসকের ঝুঁকি কমে যায়। অনেক সময় সময় দেখা যায়, অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেক্ষেত্রে চিকিৎসক, নার্স এমনটি চিকিৎসাসেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোন ব্যক্তির একটি হাঁসিমাখা মুখে বা সুমধুর কণ্ঠে “সব ঠিক হয়ে যাবে” বা দু’টি সমানুভূতিশীল বাক্য অনেকটাই রোগীর ‘মানসিক ওষুধ’ হিসাবে কাজ করে।

একজন অসুস্থ হলে, চিকিৎসা নিরাময়ের জন্য রোগী নিজে সিদ্ধান্ত পরিপূর্নভাবে একা নিতে পারেন না। আমরা এভাবে বলতে পারি, রোগী একা লড়াই করেন না। পাশে থাকেন আপনজন বা তার স্বজনেরা। তাদের উদ্বেগ, আশঙ্কা বুঝে প্রয়োজনমতো জানানো ও প্রশমিত করাই পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে মসৃণ করে তোলে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবেশ সুন্দর বা অর্থবহ হিসেবে গড়ে তুলতে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা দাতা প্রতিষ্ঠানের অর্থাৎ একতরফাভাবে দায়িত্ব পালন নয় বরং দুই পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমেই একটি সু-সম্পর্ক যেমন গড়ে উঠবে ঠিক তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থাও উন্নতিতে পরিনত হবে। ডাক্তার, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী সবার মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা জরুরি। নিয়মিত শর্ট ব্রিফিং অথবা সংশ্লিষ্ট সকলকে তথ্য-আপডেট শেয়ার করার ব্যবস্থা রাখলে টিম হিসেবে কাজের মান বাড়ে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সাথে প্রতিটি ব্যক্তি যেমন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবাদাতা সবাই রোগী বা রোগীর স্বজন কর্তৃক সবসময় ভালো ব্যবহার ও ধৈর্য্যশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মানবতার পুনর্গঠনে স্বাস্থ্য’কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে WHO প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর হবার পর থেকে আজও ডঐঙ বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সমন্বিত, ন্যায়সঙ্গত ও প্রযুক্তিনির্ভরভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর স্বীকৃত ছয়টি Health Dimension শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক ও পরিবেশগত এই ছয়টি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে মানবিক সম্পর্কের উন্নয়ন অপরিহার্য। শারীরিক দিক (Physical Dimension)- শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের উচিত রোগীর উপসর্গ মনোযোগ দিয়ে শোনা, সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান। নার্সদের সহানুভূতিশীল আচরণ রোগীর মানসিক চাপ কমিয়ে সুস্থতা ত্বরান্বিত করে। রোগীর অ্যাটেনডেন্টদের উচিত চিকিৎসা দলের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব রাখা। মানসিক দিক (Mental/Emotional Dimension)-রাগীর উদ্বেগ বা ভয়ের সঙ্গে মানসিক সহায়তা দিয়ে চিকিৎসা কর্মীদের সহানুভূতিশীল ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার-নার্সদের দায়িত্ব, রোগী ও তার স্বজনদের মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং বা সহায়তা প্রদান করা। সামাজিক দিক (Social Dimension)-রোগীর পরিবার, আত্মীয় ও সহচররা তার সামাজিক বেষ্টনির অংশ। একটি আন্তরিক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা গেলে চিকিৎসা প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোগী-অ্যাটেনডেন্টদের জন্য সামাজিক নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। আধ্যাত্মিক দিক (Spiritual Dimension)-ধর্মীয় বিশ্বাস বা আত্মিক মানসিকতা অনেক সময় রোগীর চিকিৎসা গ্রহণে সহায়তা করে। এই দিকটি বিবেচনায় রেখে তাদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত চিকিৎসকদের। এ ক্ষেত্রে ‘সেবা এক প্রকার ইবাদত’ এই চেতনা স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বৌদ্ধিক দিক (Intellectual Dimension)-ডাক্তার, নার্স, রোগী ও অ্যাটেনডেন্টদের চিকিৎসা সম্পর্কিত সঠিক তথ্য জানা জরুরি। চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে রোগী ও তার পরিবারের মতামত গুরুত্ব দেওয়া ও স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা কেবল শারীরিক চিকিৎসা (Medical treatment) প্রতিস্থাপন করে না; এর সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কাউন্সেলিং (Counseling) ও স্বাস্থ্য শিক্ষাও অপরিহার্য অংশ। যার মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি সু-সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। আর এই সু-সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, কাউন্সেলিংও খুবই জরুরি?

রোগী কঠিন বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশায় ভূগে থাকেন। যেমন ডায়াবেটিক ও কিডনী অন্যান্য সমস্যায়। কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে, ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সামলে মনোবল বজায় রাখবে এই সব বিষয়েই কাউন্সেলিং রোগীকে সহায়তা করে মানসিক সমর্থন দেয়া খুবই জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ওবেসিটি ইত্যাদি শুধু ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যকলাপেও পরিবর্তন আনতে হয়। এই সব ক্ষেত্রে কাউন্সেলর বা স্বাস্থ্য শিক্ষকের কথা মেনে করলে রোগী স্বাস্থ্যবান অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত হয়। রোগীর পরিবার-আত্মীয়দেরও মানসিক চাপ, যতেœর দায়িত্ব ও খরচ নিয়ে উদ্বেগ থাকে। পরিবার-কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে তারা জানতে পারে কীভাবে রোগীকে সঠিক যত্ন দিতে হবে, কী সময় চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে উদ্বেগ কমায়। অনেক রোগী ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের দ্বারা মানসিক শান্তি পেয়ে থাকেন। এই চাহিদা বুঝে আধ্যাত্মিক কাউন্সেলিং (ঈযধঢ়ষধরহপু ঈধৎব) বা সামাজিক সহায়তা গাইড করলে রোগীর সামগ্রিক সুস্থতা বৃদ্ধি পায়। হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী শুধু ওষুধেই নয়, পুনঃর্বাসনের সময় শারীরিক, মানসিক ও পুষ্টি সংক্রান্ত কাউন্সেলিং পায়। এতে তাদের স্বাধীনতা, আত্মসম্মান ও জীবনমান ফিরে আসে।
একটি সমন্বিত ও সু-সম্পর্কের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং দু’টিকে মাথায় রেখে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। শারীরিক উপশমের পাশাপাশি মানসিক শান্তি, আচরণগত পরিবর্তন ও পরিবারের সমর্থন চক্র গড়ে তুলতে হলে Counseling অপরিহার্য। তাই আধুনিক স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসা এবং কাউন্সেলিং দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে উন্নত, মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

দীর্ঘ দিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, স্বাস্থ্যখাতে সু-সম্পর্ক তৈরি এটি অতিরিক্ত বিলাসিতার কোন বিষয় হবে না, বরং ‘ভালো চিকিৎসা’বা ‘ফলপ্রসূ চিকিৎসা’র অবিচ্ছেদ্য অংশ। আস্থা, সহানুভূতি ও তথ্যের স্বচ্ছতায় গড়ে ওঠা এ সম্পর্ক রোগীকে একদিকে যেমন দ্রুত আরোগ্য দিবে, সেবাদাতার কাজকে দক্ষ করে তোলবে এবং অন্যদিকে একটি মানবিক সমাজ বিনির্মানে অবদান রাখবে। তাই চলুন, স্বাস্থ্যসেবাকে শুধুমাত্র ফিজিক্যাল টাস্ক হিসেবে আমরা না দেখে, মানবিক বন্ধনের মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলি। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি বা ওষুধ নয়, বরং চিকিৎসক, নার্স, রোগী ও রোগীর অ্যাটেনডেন্টদের মাঝে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা WHO-এর স্বীকৃত ছয়টি Health Dimension-এর আলোকে যদি প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করি, তবে আমাদের চিকিৎসা পেশা হয়ে উঠবে আরও ফলপ্রসূ ও মানবিক। সু-সম্পর্ক’কে স্বাস্থ্যনীতির মূলধারা হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হবে, যার মাধ্যমে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বাড়াবে না, একটি সুস্থ, সচেতন, সংবেদনশীল ও আস্থাভাজন সমাজ গঠনের পথকেও প্রসারিত করবে।

লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
MSS (Social Work); MPH (Hospital Management)
জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী, সমাজকর্মী ও কলামিস্ট

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}