গন্তব্যহীন যাত্রা, লক্ষ্যের সন্ধানে ছুটছি , মায়া, ভালবাসা আর বাস্তবতার বন্দরে নৌকা ভিড়াই কিন্তু লক্ষ্যের দেখা পাইনা, আবারো ছুটে চলি দিকহারা নাবিকের মত ——যদি লক্ষ্যের দেখা মেলে তবে স্বপ্ন হবে সত্যি। বলছিলাম, প্রবাসে পাড়ি জমানো সাফিউল ইসলামের কথা। সাফিউল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামারদহ ইউনিয়নের রসুলপুর বালুপাড়া গ্রামের জলিল শেখের পুত্র।

এক সময়ে ওই গ্রামেবাসীর সামনে প্রতিদিন ভেসে আসত এক তরুণের প্রাণচঞ্চল কণ্ঠস্বর সাফিউল। ওই গ্রাম আজ নিরব নিস্তব্ধ। বইছে শোকের মাতম। সে ছিল একজন সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব। জলিল শেখের আদর্শ পুত্র, প্রিয় বন্ধু, সহপাঠীসহ গ্রামের সবার গর্ব। আজ সে নেই। তার নিথর দেহ নিরব নিস্তব্ধে পড়ে আছে প্রবাসে। সে রেখে গেছে শত প্রশ্ন, গভীর হাহাকার, আর একটি মাত্র চাওয়া “বুঝতে পারো কি আমি কী চেয়েছিলাম”?

শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের এক চিলতে সুখ আর মুখ ভরা হাসি ফোটাতে নিজের সুখকে জলাঞ্জলি দিয়ে সুখ কিনতে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন বিদেশে। হতে চেয়ে ছিলেন ভাগ্য উন্নয়নের জন্য একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা। কিন্তু সবাই তো সুখ চায় আর সবাই যে সুখ পাবে এমন নিশ্চিত কথা তার জানা ছিল না।

সাফিউল সেই লক্ষ্যের সন্ধানে গত বছরের মে মাসে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে আড়াই লাখ এবং স্থানীয়ভাবে আরও ১ লাখ টাকা ঋণ করে এক দালালের মাধ্যমে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কাজ না পেয়ে ১৫ মাস ধরে বিভীষিকাময় জীবন কাটতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত না খেয়ে অসুস্থ হয়ে রাস্তায়, মসজিদে, আর ফ্লাইওভারের নিচে দিন কাটতে গিয়ে জীবন থমকে যায় এক হাসপাতালের গেটে। তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রিয় বন্ধু, সহপাঠীদের সাথে আর কথা হবে না, তবে
চলার পথে ছায়া হয়ে থাকবে তার অপার মমতা আর ভালবাসা।

পরিবার সূত্র জানায়, সেখানে পৌঁছে কোনো চাকরি না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন সাফিউল। অর্থের অভাবে তিনি মসজিদে মসজিদে খাবার চাইতেন, কখনো রাস্তায়, কখনো আবার ফ্লাইওভারের নিচে রাত কাটতেন। দীর্ঘ কষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসার সুযোগ মেলেনি। গত ২৮ জুলাই সৌদি আরবের এক হাসপাতালের গেটে মৃত্যু হয় সফিউলের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একই গ্রামের প্রবাস ফেরত মিস্টার নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে সাফিউল ও রনি নামে দুই যুবক সৌদি আরবে পাড়ি জমান। তবে সঠিক কাগজপত্র না থাকায় দু’জনই কাজ পাননি। সাফিউল মারা গেলেও রনি এখনো কাটছেন মানবেতর জীবন। পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে দালাল মিস্টার গা ঢাকা দিয়েছেন। যোগাযোগ করলেও কোনো সহায়তা করছেন না। মৃত্যুর অর্ধমাস পেরিয়ে গেলেও আর্থিকসহ নানা সংকটে আজও মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এমন শোকে উদ্যেগ-উৎকণ্ঠায় কাতর অসহায় বাবা-মার বাঁধভাঙ্গা আর্তনাদ “তোমরা আমার বুকের মানিককে ফিরিয়ে এনে দাও!”

গাইবান্ধা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মো. নেশারুল হক বলেন, “পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে মরদেহ দেশে আনতে সরকারি সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}