বয়স বাড়লে মানুষ নাকি পুরানো দিনগুলোর দিকে বারবার ফিরে যেতে চায়। আমি তার ব্যতিক্রম নই। এই জীবনের নানা ব্যস্ততা, টানাপোড়েন, সাফল্য আর ব্যর্থতার ভিড়ে হঠাৎ কোনো দুপুর কিংবা একাকী সন্ধ্যায় মনে পড়ে যায় গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত পাঠক প্রিয় “দৈনিক ঘাঘট” পত্রিকার কথা। ২০০০ সালের পর এক সময়ে আমিও এ পত্রিকাটির একজন সংবাদকর্মী ছিলাম।

সে সময়ে আমার সহকর্মী ছিলেন, ফুলছড়ির আমিনুল ইসলাম, সাঘাটার জয়নাল আবেদীন, ধাপেরহাটের আমিনুল, সুন্দরগঞ্জের মোশারফ হোসেন বুলু ভাই, পলাশবাড়ীর মশিউর, গোবিন্দগঞ্জের রফিকুল ভাইসহ আরও অনেকে। সে সময়ও আমাদের পরিবেশিত সংবাদে পত্রকাটি ছিল প্রাণবন্ত।

সার্কুলেশনে সেরা হয়ে জেলার স্বর্বত্র একটি পাঠক নন্দিত পত্রিকা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে ছিল। কয়েক বছর দায়িত্ব পালনের পর সময় আমাকে ছিটকে দিয়েছে জাতীয় পত্রিকায়। তাই দৈনিক ঘাঘট’কে সময় দিতে ব্যর্থ হয়েছি।

এরপরও থেমে থাকেনি দৈনিক ঘাঘটের পথচলা। এই জেলা শহরের মাটিতে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে কিছু স্বপ্ন, কিছু শব্দ, আর কিছু সাহসী কলম যোদ্ধা। যারা কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পত্রিকাটির চলার পথকে অবিচল রেখেছে। কখনো এটি নদীর ধারার মত শান্ত, কখনো বা উত্তাল। পত্রিকাটির এ অবিচল পথচলায় মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করলে মনে হয়, আমি এখনো হাটছি সেই পথ ধরে… যেন সময় থেমে আছে ঠিক সেইখানে।

এরপরও কোথাও চায়ের টেবিলে কিংবা কোন দপ্তরে পত্রিকাটি চোখে পড়লে বুকের ভেতর কিছুটা যেন কেঁপে উঠে। দৈনিক ঘাঘট শুধু একটি প্রকাশনা নয়, এটা একটা অনুভূতির নাম, একটা লড়াইয়ের নাম, একটা চলার গল্প।

পত্রিকাটির প্রতিটা সংখ্যা যেন একটা সময়ের দলিল। যারা লিখছেন, তারা পত্রিকাটির সাথে বেঁধেছেন নিজেদের একটা আত্মিক সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক কখনো হারিয়ে যাবে না। পত্রিকাটির এ অব্যাহত পথচলা হয়ে উঠেছে অনেকের কাছে নিজের লেখালেখির এক সূচনাপথ। পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক আব্দুস সামাদ সরকার বাবু নামটা উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে যায় এক নিরলস কর্মীর মুখ। সংবাদকে শুধু ভালোবেসে নয়, দায়িত্ব নিয়ে তিনি কাজ করে যান নিঃশব্দে, দৃঢ়তায়।

যখন এতো প্রযুক্তি ছিলো না, হাতে গোণা কিছু টুলস আর অফুরন্ত মনোযোগ ছিলো তার সম্বল। কিছু মানুষের পরিচয় লেখা থাকে না ব্যানারে, তাদের কাজই হয়ে উঠে তাদের পরিচয়। প্রেসের গন্ধ, ছাপার অক্ষরে মিশে থাকা যার নিঃস্বার্থ শ্রম, একটি বানানের ভুলেও যিনি আঁচ করেন সংবাদের অপমান যেন হয়ে যাবে। তাই তো তিনি আজও আছেন পরিপূর্ণ এক দায়বদ্ধতায়, যার নাম আজও শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হয় পত্রিকাটির পৃষ্ঠায়, স্মৃতির পাতায়।

আব্দুস সামাদ সরকার বাবু এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু নিজের মেধা দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে সাংবাদিকতাকে ভালোবাসেন। তিনি চাইলে ঢাকার নামী পত্রিকায়, নামী প্রতিষ্ঠানে অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারতেন। তার লেখার জোর, সম্পাদনার মুন্সিয়ানা, প্রুফে নিখুঁত নজর সবকিছুই জাতীয় পর্যায়ে কাজ করার মতো। তবুও তিনি ভালোবাসেন নিজের মাটি, নিজের শহর, নিজের মানুষদের সঙ্গে থাকতে।

গাইবান্ধা জেলা শহরটাই তার ভালোবাসার জায়গা। এখানকার তরুণদের লেখালেখিতে উৎসাহ দেওয়া, রাত জেগে প্রুফ দেখা, নীরবে পাশে থাকা। এসবই তিনি করে যাচ্ছেন কোনো স্বীকৃতির আশায় নয়, একান্ত ভালোবাসা থেকে। এমন একজন মানুষের নেতৃত্বে গড়া পত্রিকা কখনোই শুধু খবর প্রকাশ করে না- বরং মানুষ গড়ে, সমাজ সচেতন করে তোলে এবং সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে শেখায়।

আব্দুস সামাদ সরকার বাবু তার কাজ, নীতিবোধ এবং ভালোবাসা দিয়ে প্রমাণ করে আসছেন সম্পাদক যদি সত্যিই দায়বদ্ধ হন, তবে তার কলম দিয়েই সমাজ বদলানো সম্ভব।

প্রযুক্তির যুগে এক নতুন বাতাস বইছে পত্রিকাটির আঙ্গিনায়। সংবাদকর্মীদের নুতন উদ্যোগ আর উচ্ছ্বাসই প্রমাণ করে, পত্রিকা কখনো পুরোনো হয় না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা শুধু রূপ বদলায়, কিন্তু প্রজ্ঞা আর অনুভূতির ধার একটুও কমে না। এদের দেখে আশার আলো জাগে, চেষ্টা বৃথা যায়নি। পত্রিকাটির এই অবিচল ধারা ঠিকই এগিয়ে নিয়ে যাবে নতুনরা, এ প্রত্যাশাই রইল।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}