প্রথম অধ্যায় : ভূমি রহস্য
প্রাচীন বঙ্গদেশের অন্তঃপুরে, অজপাড়াগাঁয়ের অন্তরালে এক বিস্তীর্ণ ভূমি রহিয়াছে, যাহার আয়তন শত একরের অধিক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম লোকেরা উহাকে “অভিশপ্ত শত একর” নামেই ডাকিয়া আসিতেছে। কারণ, কাহারও সাহস হইয়াছে না উক্ত ভূমিতে গৃহ নির্মাণ করিবার, চাষাবাদ করিবার কিংবা দীর্ঘকাল অবস্থান করিবার।
গাঁয়ের প্রবীণগণ বলিতেন—
“ওই শত একরে রাত্রি নামিলেই অদ্ভুত প্রদীপ জ্বলে, অশরীরী কণ্ঠে ভেসে আসে হাহাকার, আর ভোর হইলে মাটিতে লালচে রক্তচিহ্নের ন্যায় ছোপ দৃষ্ট হয়।”
অনেকে উহাকে কেবলই কুসংস্কার বলিয়া উড়িয়ে দিয়াছে। তথাপি বাস্তব অভিজ্ঞতা যাহারা অর্জন করিয়াছে, তাহারা আর কখনো মুখ খুলিতে সাহস পায় নাই।
দ্বিতীয় অধ্যায় : উত্তরাধিকার
স্থানীয় জমিদার বংশের শেষ উত্তরসূরী, যুবরাজ আফতাবউদ্দীন চৌধুরী, একদিন পিতার পুরাতন নথিপত্রে রহস্যময় দস্তাবেজ আবিষ্কার করেন। তদ্রূপ এক মানচিত্র, যাহাতে স্পষ্টত লাল কালিতে চিহ্নিত রহিয়াছে শত একরের সীমা। দস্তাবেজে লিখিত—
“যে উত্তরাধিকারী সত্য সাহসী, কেবল তাহারই হাতে মুক্ত হইবে এই ভূমির অভিশাপ।”
আফতাবউদ্দীন, বিদ্যাশিক্ষায় প্রাজ্ঞ, কুসংস্কারে অবিশ্বাসী, সংকল্প করিলেন অভিশপ্ত শত একরের গোপন রহস্য উদ্ঘাটন করিবেন।
তৃতীয় অধ্যায় : প্রেম ও প্রতিজ্ঞা
একই গ্রামে বাস করিতেন এক দরিদ্র কৃষকের কন্যা—মেহেরুন্নিসা। রূপে-গুণে অতুলনীয়া, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম আঘাতে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ শোকস্মৃতিতে আচ্ছন্ন। আফতাবউদ্দীন ও মেহেরুন্নিসার হৃদয়ের মিলন এক অনিবার্য নিয়তি বলিয়াই প্রতিভাত হইল।
মেহেরুন্নিসার কণ্ঠে আফতাব প্রথম শুনিলেন শত একরের অভিশপ্ত কাহিনী। সে বলিল—
“হুজুর, শত একরে প্রবেশ মানেই মৃত্যুর আহ্বান। যদি আমার প্রাণের মায়া থাকে তবে ওই ভূমির দ্বার অতিক্রম করিবেন না।”
কিন্তু আফতাবউদ্দীন দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিলেন—
“প্রিয়তমা, অভিশাপকে সত্য প্রমাণ করা কাপুরুষের কাজ। আমি যাইব, এবং ফিরিয়া আসিব তোমার হাত ধরিবার জন্য।”
চতুর্থ অধ্যায় : অন্ধকার অভিযাত্রা
পূর্ণিমার রাতে আফতাবউদ্দীন বিশ্বস্ত সঙ্গীসহ শত একরে প্রবেশ করিলেন। প্রথমে কিছুই ঘটিল না। কিন্তু ক্রমে অদ্ভুত শব্দ, বাতাসে শীতল হাহাকার, বৃক্ষশাখায় অগ্নিশিখার মতো আলো নৃত্য করিতে লাগিল। সঙ্গীরা আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া পালাইয়া গেল, কেবল আফতাব অবিচলিত থাকিলেন।
অচিরে তিনি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে উপনীত হইলেন। প্রাচীন ভগ্ন মন্দিরের দেয়ালে রক্তলেখার ন্যায় উৎকীর্ণ রহিয়াছে—
“শত একর ভর করিল যাদের রক্তে, তারা চিরদিন ফিরিবে প্রতিশোধ লইতে।”
পঞ্চম অধ্যায় : অতীতের ছায়া
কয়েক শত বৎসর পূর্বে, এক রক্তলোলুপ জমিদার জোরপূর্বক গ্রামবাসীর শত একর জমি দখল করিয়া লইয়াছিল। বিদ্রোহ দমন করিতে গিয়া শত শত প্রাণ ঝরিয়া পড়ে। মায়ের বুক খালি হইয়াছে, কন্যা নির্যাতিত হইয়াছে, অগণিত কৃষক রক্তে ভিজাইয়াছে ভূমি। সেই রক্তের আক্রোশই পরিণত হইয়াছে অভিশাপে।
ষষ্ঠ অধ্যায় : মুক্তির অর্ঘ্য
আফতাবউদ্দীন উপলব্ধি করিলেন, অভিশাপ ভাঙিবার উপায় বলপ্রয়োগ নহে; চাই প্রায়শ্চিত্ত ও রক্তঋণ শোধ। তিনি জমিদারী হস্তান্তর করিলেন গ্রামের দরিদ্র প্রজাদের নিকট। শত একর জমি হইল সাধারণ কৃষকের সমবায়ের অধিকারভুক্ত।
ভোর হইবার লগ্নে, ভূমি হইতে রক্তচিহ্ন মিলাইয়া গেল, হাহাকার স্তব্ধ হইল। শত একরের অন্ধকার ভেদ করিয়া উদিত হইল নতুন দিনের সূর্য।
সপ্তম অধ্যায় : প্রেমের পূর্ণতা
মুক্ত ভূমির কণ্ঠে এখন আর্তনাদ নাই, বরং কৃষকের গান বাজিতেছে। আফতাবউদ্দীন চৌধুরী ও মেহেরুন্নিসা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। তাঁদের দাম্পত্য হইল এক প্রতীক—যতদিন সত্য, প্রেম ও ন্যায়ের জয় থাকবে, ততদিন কোনো অভিশপ্ত ভূমি থাকিবে না।