গাইর গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের হরিজন পাড়ার দুপুরটা ছিল অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান- ‘আমরাও মানুষ, সমান মর্যাদা চাই।’ সূর্য তেজি, কিন্তু তার চেয়েও গরম প্রতিবাদের ভাষা। কয়েক দশকের ক্ষোভ, অপমান আর বঞ্চনার কথাগুলো যেন ফেটে পড়ল হরিজন জনগোষ্ঠীর কণ্ঠে।

রোববার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শাখার উদ্যোগে ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেন শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। তাদের দাবি- হোটেল-রেস্টুরেন্টে অবাধ প্রবেশ ও খাবার গ্রহণের নাগরিক অধিকার এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করা।

মানববন্ধনে দাঁড়ানো সুনীতা বাসফোর, স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী। শান্ত স্বরে বললেন, ‘আমরা যদি অন্যের ঘর পরিষ্কার করতে পারি, তবে সেই ঘরের হোটেলে বসে খেতে পারব না কেন? এখনও মহিমাগঞ্জে কিছু হোটেলে গেলে বলে- তোমাদের জন্য আলাদা থালা আছে! এতে লজ্জা পাই না, অপমান লাগে।’

তার কথার সঙ্গে সায় দিলেন ঘরুয়া বাসফোর, যিনি তিন দশক ধরে এলাকার পরিচ্ছন্নতা কর্মী। ‘আমরা দেশের নাগরিক হয়েও নাগরিকের মর্যাদা পাই না। একদিকে কাজের অবহেলা, অন্যদিকে ভূমিহীন জীবন। শত বছর ধরে এখানে আছি, অথচ এই জায়গার মালিক আমরা না,’ বললেন তিনি।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও হরিজন জনগোষ্ঠী আজও পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা পায়নি। সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি তারা ভুগছে ভূমিহীনতার সংকটে। কেউ কেউ প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই জায়গায় বসবাস করলেও জমির কাগজ নেই তাদের হাতে। বক্তাদের ভাষায়, ‘লাখো শহিদের রক্তে অর্জিত এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন হরিজন, দলিত, আদিবাসীসহ সব মানুষ সমান মর্যাদায় বাঁচতে পারবে।’

তারা অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক অবহেলায় হরিজন জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তার ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। অথচ এ জনগোষ্ঠীই পরিচ্ছন্নতা ও সেবার কাজে শত বছর ধরে অবদান রেখে আসছে।

মানববন্ধনের আগে মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি সন্তোষ বাসফোর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন অবলম্বনের প্রধান নির্বাহী প্রবীর চক্রবর্তী, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের সদর উপজেলা আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা, লেখক- সাংবাদিক কায়সার রহমান রোমেল, মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু সুফিয়ান সুজা, গণফোরাম নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

তারা বলেন, হরিজন জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার ও ভূমি মালিকানা নিশ্চিত করা কেবল মানবিক বিষয় নয়, এটি সাংবিধানিক দায়িত্বও। সমাজে সমতা ও মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না হলে স্বাধীনতার চেতনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

বৃদ্ধ সুধীর বাসফোরের এক কথায় হয়ত হরিজন সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা সবচেয়ে গভীরভাবে বোঝা যায়- ‘আমরা শহর পরিষ্কার রাখি, কিন্তু আমাদের জীবনের ময়লা-অবহেলা, ঘৃণা আর বৈষম্য কে পরিষ্কার করবে?’

গোবিন্দগঞ্জের হরিজনদের এই প্রশ্ন কেবল তাদের নয় বরং পুরো সমাজের সামনে এক কঠিন আয়না তুলে ধরে- স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও কি বাংলাদেশের সব নাগরিক সত্যিই সমান মর্যাদা পেয়েছে?

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}