“বিদ্যালয়, মোদের বিদ্যালয়, এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়।” এখানে সত্য-সত্যিই সভ্যতার ফুল ফোটানো হয়। যেখানে রয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে বিদ্যা লাভের সুযোগ। যেখানে ব্যতিক্রম পরিবেশে করা হয় পাঠদান। ব্যতিক্রম সেই বিদ্যাপিঠের নাম ‘চকদাতেয়া জামাদারের ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।’ এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের আধুনিক সৃজনশীল পদ্ধতিতে করা হয় পাঠদান।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলা হতে ১০ কিলোমিটার দূরে পদুমশহর ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী চকদাতেয়া
গ্রাম। এই গ্রামে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিদ্যাপিঠ। মূলত প্রতিষ্ঠা লগ্নে এটি ছিল একটি জৌলস বিহীন টিনসেডের ঘর। শিক্ষকদের বেতন নেই, ভাতা নেই, উন্নত রাস্তা নেই, তেমন ছাত্র/ছাত্রী নেই, শুধু নেই আর নেই। কিছু উদার মনা মানুষের শুভ কামনা আর বুদ্ধি পরামর্শ, শিক্ষক নামের ওই সময়ের তরুনদের উদ্যমতা আর আশে পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চ্যালেঞ্জের মুখে প্রধান শিক্ষক পদে এর হাল ধরেন উদ্যমী শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম পলাশ।

তিনি প্রধান শিক্ষকের আসন লাভ করেই প্রথমেই দৃষ্টি দেন প্রতিষ্ঠানের সরকারি স্বীকৃতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠ দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী অভিভাবকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ, শ্রেণিকক্ষ নিমার্ণসহ নানান দিকে। তার কাজের গতি উদ্যমতা আর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন শিক্ষকমন্ডলী, অভিভাবক আর এলাকাবাসী।
ব্যাস, শুরু হল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর ২০১৩ সালে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে এই বিদ্যাপিঠ। এটি এখন ইট, পাথরের তৈরি দ্বিতল ভবন। এ বিদ্যাপিঠের যাত্রা বর্তমানে এই এলাকার মানুষের জন্য আশির্বাদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে আসছে।

বর্তমানে ৬ জন শিক্ষক দিয়ে ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর চলছে পাঠদান। গাছ-গাছালি আর পাখপাখালির কলতানে গ্রামীণ পরিবেশের ছোঁয়া যেন হৃদয় কেড়ে নেয় শহর ছেড়ে গ্রামের কারুকার্য অঙ্কিত, দৃষ্টিনন্দন এই বিদ্যাপীঠ। যেখানে সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে এই বিদ্যাপীঠ অঙ্গন। প্রকৃতির কাছে, গ্রামীণ পরিবেশের বিদ্যাপিঠটি নান্দনিকতার ছোঁয়ায় যেন নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। আপন মনে শিশুরা খেলা করছে। লেখাপড়া করছে মনের আনন্দে।

বুধবার (১৯ নভেম্বর) সকাল ১১টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অসাধারণ সাদামাটা একটি গ্রাম চকদাতেয়া জামাদারের ভিটা। যেখানে সকাল থেকেই জীবনযুদ্ধ শুরু হয় খেটে খাওয়া মানুষের। মা-মাটির গন্ধ যেখানে মিশে আছে। সেখানেই আধুনিক পরিবেশে শিক্ষা লাভ করছে শিক্ষার্থীরা। ভোরে আলো ফোটার পর যেখানে পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙে যায়। শিক্ষার জন্য এটি একটি সুন্দর এবং মনোরম পরিবেশ। এখানে শিশুরা মনের আনন্দে খেলা করে। শিশুদের জন্য রয়েছে খেলার মাঠ। গাছ-গাছালী আর সবুজ পাতার ফাঁকে তারা যেন শৈশবকে হাসি, ঠাট্টা আর আনন্দ উপভোগ করে কাটিয়ে দিচ্ছে।

জানা যায়, কাব স্কাউট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এ বিদ্যাপিঠের সহকারী শিক্ষিকা মনিরা বেগম। যোগদানের প্রায় দুই মাস গত হচ্ছে। তিনি যোগদান করেই শিশুদেক
পাঠক্রম এর সাথে কাব স্কাউট কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করিয়ে তাদের আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সৎ, চরিত্রবান, কর্মোদ্যোগী, সেবাপরায়ণ, সর্বোপরি সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করছেন। এর পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছেন। তার ইতিবাচক মনোভাব এবং কর্মোদ্যোগ এ বিদ্যাপিঠের সামগ্রিক পরিবেশ উন্নত করতে সাহায্য করছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তার কাজ অন্যান্য শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে, এবং এ বিদ্যাপিঠকে একটি মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

এ দিন প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম পলাশ
ছুটিতে থাকায় সহকারী শিক্ষিকা মনিরা বেগম জানান,
শিশুদের পাঠক্রম এর সাথে কাব স্কাউট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ তাদেরকে আনন্দের মাধ্যমে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখতে সাহায্য করে। কাব স্কাউটিং শিশুকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলে। অপরকে সাহায্য করার মনোভাব শিশু বয়স থেকেই গড়ে ওঠে। একজন কাব স্কাউট দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল সম্পর্কে জানতে পারে। কাব স্কাউটরা পরবর্তীতে যোগ্য নাগরিক হয়ে সঠিক পথে সমাজ ও দেশকে পরিচালিত করতে পারে। তিনি জানান,
সরকারিভাবে প্রাপ্ত বরাদ্দ দ্বারা এ প্রতিষ্ঠানটিকে আরও স্মার্ট ও দৃষ্টিনন্দন বিদ্যাপিঠে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান মুখী হয়। এতে পাঠের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা উপকরণ ব্যবহারে শিশুদের একঘেয়েমি দুর হবে। বিদ্যালয়টি শিশুদের জন্য হয়ে উঠবে আরও আনন্দমুখর। প্রত্যাশা এ প্রতিষ্ঠান এক দিন জাতীয় পর্যায়ে উন্নিত হবে। উন্মোচন হবে নয়া দিগন্তের।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}