ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্হস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান আজিমপুরের গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ১০.৩ একর জায়গার এই প্রতিষ্ঠানে চার হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র একটি হলে—জাহানারা ইমাম হলে। তিনটি ভবন নিয়ে গঠিত এই হলটি পরশু থেকে আজ পর্যন্ত হওয়া পরপর ভূমিকম্পে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভবনগুলোর জীর্ণ দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে রাত কাটালেও হল কর্তৃপক্ষের কেউ তাদের খোঁজ নেননি—এমন অভিযোগ করেছেন তৃতীয় বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী নাদিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “এত বড় ভূমিকম্পের পরও শিক্ষক কোয়ার্টার হলের ঠিক পাশেই থাকা সত্ত্বেও একজন শিক্ষকও দেখার প্রয়োজন মনে করেননি মেয়েদের হলের অবস্থা কী! প্রশাসনও ভবনগুলো পরিদর্শন বা সেফ এক্সিট চেক করার উদ্যোগ নেয়নি।”
পরদিন শিক্ষার্থীরা উদ্বেগ জানালে হল সুপার জানান, “সেফ মনে না হলে তোমরা লোকাল গার্ডিয়ানের বাসায় চলে যেতে পারো।” এর মধ্যেই গতরাতে এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে হল গেট খুলতে চাবি পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ক্যাম্পাসে নেই কোনো জরুরি চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্রও। এক বছর আগে সিটি কর্পোরেশন ১ নম্বর ভবনটিকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাজেট সংকটের অজুহাতে এখনো সেখানে প্রায় চারশত শিক্ষার্থীকে রাখা হচ্ছে। ৩ নম্বর ভবনটির নকশায় ১০০ জনের ধারণক্ষমতা থাকলেও সেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে তিনশত শিক্ষার্থীকে।
অনুপযুক্ত ভেন্টিলেশন, অতিরিক্ত মশার উপদ্রব, দেয়ালে ফাটল ঢেকে বারবার প্লাস্টার ও রঙ করার প্রবণতাসহ বিভিন্ন সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। ২ নম্বর ভবনের একটি পিলার ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ার পরও সেখানে চলছে নতুন করে প্লাস্টারের কাজ; একই সঙ্গে ভবনটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলা নির্মাণাধীন। শিক্ষার্থীদের দাবি, এমন অবস্থায় আরেকটি ভূমিকম্প ঘটলে এই ভবনগুলো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অন্যান্য হলের মতো সংস্কারের জন্য ১৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করলে হোম ইকোনমিক্স কলেজের শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদে সরব হন। এর প্রেক্ষিতে শিক্ষকরা জরুরি বৈঠক শেষে দুপুর ১টায় নোটিশ দিয়ে জানায়, বিকেল ৫টার মধ্যে হল খালি করতে হবে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য হল বন্ধ থাকবে। হল সুপার শিক্ষার্থীদের কাছে এ সিদ্ধান্তে সমর্থনসূচক স্বাক্ষরও চান; শিক্ষার্থীরা তাতে অসম্মতি জানালে তিনি উচ্চস্বরে তাঁদের ধমক দেন এবং সতর্ক করে বলেন—৫টার পর হলে থাকলে তা তাঁদের ‘নিজ দায়িত্বে’ হবে।
নোটিশে কোনো নির্দিষ্ট হল পরিদর্শন, মেরামত বা সময়সূচির উল্লেখ না থাকায় শিক্ষার্থীরা দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলছেন। চার ঘণ্টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দিলেও স্থগিত করা হয়নি শ্রেণি কার্যক্রম। ফলে ইয়ার ফাইনালের মাঝপথে পরীক্ষা হবে কিনা, ঢাকার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে—এসব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় আছেন পরীক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী সাহানা লেখেন, “এখন কিছুই করার নেই, শুধু সৃষ্টিকর্তার নাম নিতে পারি—তা আমরা বুঝি। কিন্তু মানবিক আচরণও বলে কিছু আছে। আমাদের বড়, অভিজ্ঞ মানুষদের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য কষ্টদায়ক ছাড়া কিছুই নয়।”
পরিশেষে, ৬০ বছরের বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।