ভোরের আলো ফুটেছে অনেক আগেই। সময় গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা বাজে। রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখ আটকে আছে সামনের দিকে। কিছুই দেখা যায় না। চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে একটি আলো।

হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে আসে ট্রেন। কুয়াশার বুক চিরে ট্রেন চললেও গাইবান্ধার জনজীবন যেন আটকে থাকে সেই কুয়াশার ভেতরেই। ঘন কুয়াশায় হেডলাইট জ্বালিয়ে ট্রেন ঠিকই চলছে। কিন্তু শহর, চর আর মাঠে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন যেন ধীরগতিতে থেমে যাচ্ছে। বরাবরের মতো এবারও উত্তরের এই জেলা শহর ও আশপাশের জনপদে শীত জেঁকে বসেছে। কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন কুয়াশা। দিনের পর দিন সূর্যের দেখা মিলছে দেরিতে। আবার কোনো কোনো দিন কুয়াশার আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকছে সূর্যের আলো। শীতের দাপটে স্থবির হয়ে পড়ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

গাইবান্ধায় শীত কেবল একটি ঋতু নয়, এটি শ্রমজীবী মানুষের নীরব সংগ্রাম, কৃষকের দুশ্চিন্তা আর চরবাসীর নিত্যদিনের লড়াই। কুয়াশা এক দিন কাটবে, সূর্য উঠবে। কিন্তু শীত কাটার আগেই এই মানুষগুলোর কষ্ট কতটা কমবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। গাইবান্ধা শহরের সকাল মানেই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাজে বের হওয়ার সময়। রিকশাচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, হোটেলকর্মীরা ভোরেই বেরিয়ে পড়েন জীবিকার তাগিদে। কিন্তু ঘন কুয়াশায় সকাল গড়িয়ে গেলেও রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি কম। যাত্রী নেই, ক্রেতা নেই। আয় কমে যায় অর্ধেকেরও নিচে।

সরেজমিন কথা হয় রিকশাচালক রিয়াজউদ্দিনের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, ঠান্ডায় শরীর জমে যায়, তবু রাস্তায় বসে থাকতে হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুই-তিনটা ভাড়া হয় কি না তারও ঠিক নেই। কাজ না করলে চুলায় আগুন জ্বলে না। শীত মফস্বল শহরের নিম্নআয়ের মানুষের কাছে শুধু ঠান্ডার অনুভূতি নয়, এটি আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ারও সময়। বিকাল নামতেই কুয়াশা আরও ঘন হয়। সন্ধ্যার আগেই ফাঁকা হয়ে যায় হাট-বাজার। দোকানিরা আগেভাগেই ঝাঁপ নামান। মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় কেনাবেচা নেমে আসে অর্ধেকে। এই স্থবিরতার প্রভাব পড়ে পুরো জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

সরকারি হিসাবে গাইবান্ধা জেলায় এখন পর্যন্ত ২০ হাজার ৬০০ শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। তবে বরাবরই দুর্গম চরাঞ্চলে শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণে শীতবস্ত্র পৌছাতে হিমশিম খেতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক চর সহায়তার বাইরেই থেকে যায়। ফলে শীতের রাতে অপেক্ষা দীর্ঘ হয় চরবাসীর।

প্রচণ্ড শীত আর কুয়াশার বড় আঘাত পড়েছে কৃষিতেও। আলু এবং বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজির ক্ষেতে জমে থাকা শিশির আর ঠান্ডায় নষ্ট হচ্ছে গাছ-ফসল। রোদ না উঠায় অনেক ক্ষেতেই ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে কৃষকরা পড়ে গেছেন মহা দুশ্চিন্তায়। ফুলছড়ির এক কৃষক জানান, ফসল বাঁচাতে না পারলে পুরো বছর সংসার চালানোই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শীত তাদের কাছে শুধু একটি মৌসুম নয়, এটি টিকে থাকারও প্রশ্ন।

শহরের চেয়েও কঠিন বাস্তবতা নদীবেষ্টিত চরগ্রামগুলোতে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সদর ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘন কুয়াশার কারণে বেলা ১০টা থেকে ১১টার আগে কিছুই দেখা যায় না। নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত হয়ে ওঠে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই কাজের জন্য বের হতে পারেন না। আয় বন্ধ থাকায় অচল সংসারের চাকা। অনাহারে-অর্ধাহারে কেটে যায় দিনের পর দিন।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}