ইতিহাসের পাতায় কিংবা রূপালী পর্দার মহাকাব্যে ক্ষমতা বা ‘সিংহাসন’ সবসময়ই এক পরম আরাধ্য কিন্তু অভিশপ্ত লক্ষ্য হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। ফিকশন সিরিজ ‘গেম অফ থ্রোনস’ এ আমরা দেখেছি সাতটি রাজত্বের জন্য যে লড়াই, তার মূলমন্ত্র ছিল “In the game of thrones, you win or you die.” কিন্তু এই কাল্পনিক গল্পের চেয়েও নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমরা দেখি উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে। এটি কেবল একটি সাম্রাজ্যের পতনের গল্প নয়, এটি হলো ক্ষমতার অন্ধমোহে রক্তের উত্তরাধিকার ধ্বংস করার এক করুণ আখ্যান। উসমানীয় সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের কারিগর সুলতান সুলেমান, যাকে বিশ্ব চেনে ‘সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ নামে। কিন্তু তার রাজত্বের উজ্জ্বল আলোর নিচে ছিল গভীর অন্ধকার। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেহজাদা মুস্তফা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়, রণকুশলী এবং জনগণের আশার প্রতীক। কিন্তু ক্ষমতার ব্যাকরণ বলে, রাজার চেয়ে রাজপুত্রের জনপ্রিয়তা বেশি হলে রাজার সিংহাসন টলমলে হয়ে যায়। গেম অফ থ্রোনসের দাবার চালের মতো, ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সুলতান সুলেমান তার নিজের যোগ্যতম পুত্র মুস্তফাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে মেজ পুত্র বায়েজিদকেও একই ভাগ্যের বরণ করতে হয়। এটি ছিল উসমানীয়দের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। জনপ্রিয়তার এই ভীতি বা ‘ক্ষমতা নিজের করে নেয়ার লোভ সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, কারণ যোগ্য উত্তরসূরির বদলে সুযোগসন্ধানীরা প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে।

উসমানীয় ইতিহাসে ৩য় মুরাদ এবং ৩য় মেহমুদ সিংহাসন রক্ষায় তাদের ১৯ জন ভাইকে পর্যন্ত হত্যা করেছিলেন। ক্ষমতার এই তৃষ্ণা যখন রক্তের নদী বইয়ে দেয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে পড়ে। যোগ্যতম ভাইদের হত্যা করে অযোগ্য বা মানসিকভাবে অসুস্থদের (যেমন: ১ম মুস্তফা) সিংহাসনে বসানো হয়। যখন সেনাবাহিনী (জানিসারি) বুঝতে পারে ক্ষমতার পালাবদল কেবল রক্তের মাধ্যমেই সম্ভব, তখন তারা রাষ্ট্র শাসনের চেয়ে রাজনীতিতে বেশি জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শিল্প বিপ্লব ও রেনেসাঁ যখন ইউরোপকে আলোকিত করছে, উসমানীয়রা তখন গৃহযুদ্ধে ব্যস্ত। ফলে ট্যাক্স ব্যবস্থা ও বাণিজ্য সুবিধাগুলো ইউরোপীয় শক্তির কাছে চলে যায়। আধুনিক বাংলাদেশের ‘পলিটিক্যাল উইন্টার’ বা রাজনৈতিক শীতকাল এর প্রবাহমান এই সময়কে ব্যাখ্যা করতে চাইলে, একজন আইনজ্ঞ এবং বিশ্লেষক হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আমরা এক দীর্ঘস্থায়ী ‘মহা-শীতকাল’ বা ‘মেরুরাত’ হিসেবেই দেখতে পাই ঠিক সেই ‘গেম অফ থ্রোনস’ হিসেবেই দেখতে পাই। এটি কেবল একটি ঋতু নয়, বরং একটি স্থবির অবস্থা যেখানে অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট। উসমানীয়দের সেই ‘গেম অফ থ্রোনস’ আজও আমাদের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক। যখনই কোনো দল বা গোষ্ঠী কেবল ক্ষমতার সিংহাসনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে, তখন তারা জনপ্রিয় প্রতিপক্ষকে দমনের মাধ্যমে ‘রাজনৈতিক ভ্রাতৃঘাত’ শুরু করে। এতে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো সেই ক্ষমতার যূপকাষ্ঠে বলি হয়।

কেন পরিবর্তন অনিবার্য? বিবর্তন বা এভলিউশন এর প্রাকৃতিক নিয়ম হলো, কোনো শীতকালই চিরস্থায়ী নয়। লেখক এবং বিশ্লেষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, পরিবর্তন কেবল আবশ্যকই নয়, এটি সময়ের দাবি। তবে এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার হাতবদল হলে চলবে না; এটি হতে হবে পদ্ধতিগতভাবে দৃশ্যমান। আমাদের মনে রাখতে হবে, সিংহাসন বনাম জনসেবা, ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ যা অনিবার্যভাবে কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে। আমাদের প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে নেতৃত্ব হবে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। উসমানীয় খেলাফত যখন ভেঙে পড়ছিল, মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তখন চরমপন্থার বদলে আধুনিক জাতীয়তাবাদের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ডোমেইনেও আজ উগ্র ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত চরমপন্থার চেয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ বেশি জরুরি, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করবে।

রাজনৈতিক বিবর্তন রাতারাতি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাওয়া। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, ক্ষমতার লোভে যারা নিজের যোগ্য উত্তরসূরি বা জনগণকে ধ্বংস করে, শেষ পর্যন্ত তাদের সাম্রাজ্যের সূর্যাস্ত অনিবার্য। উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়ে ম্যাপ থেকে মুছে গিয়েছিল কারণ তারা সময়ের সাথে নিজেদের বদলাতে পারেনি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক শীতকাল পেরিয়ে বসন্তের দেখা পেতে হলে আমাদের ‘গেম অফ থ্রোনস’, এর এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রক্তের বিনিময়ে সিংহাসন নয়, বরং ধৈর্য এবং সেবার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই হোক আগামীর রাজনীতির মূলমন্ত্র।

 

লেখক: মাহিন মেহরাব অনিক অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর, বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত-১, বরগুনা।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}