আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন ব্যস্ত সময় পার করছে। এ সুযোগে গাইবান্ধায় অবাধে ইট পোড়াচ্ছেন অবৈধ ইটভাটার মালিকেরা। চলতি বছর জেলায় ১২৫টি ইটভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি ভাটার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে। বাকি ১১০টি ভাটা অবৈধ। এ ছাড়া এসব অবৈধ ভাটার মধ্যে অন্তত ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে গড়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশেই ভাটামালিকেরা এসব ভাটা পরিচালনা করছেন। এগুলো উচ্ছেদে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুশিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ মাটির স্তর কেটে ইট তৈরির ফলে ফসলি জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমান বলেন, ভাটার কালো ধোঁয়া ও ইট পোড়ানোর দুর্গন্ধে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে প্রশাসনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে বাধা কোথায়, তা বোধগম্য নয়। তবে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে অভিযান শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করা হবে।
ইটভাটা স্থাপন আইন প্রসঙ্গে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ইটভাটা স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। লাইসেন্সের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্রও আবশ্যক। এ বিধান লঙ্ঘনের দায়ে দুই বছর কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আইন থাকলেও বাস্তবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। তবে লোক দেখানোভাবে ৬/৭টি ভাটায় অভিযানের পর থমকে গেছে অভিযান। প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশেই ভাটামালিকেরা এসব ভাটা চালাচ্ছেন। নইলে এত অবৈধ ভাটা কীভাবে চলছে-এমন প্রশ্ন করেন গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির। পরিবেশ অধিদপ্তর গাইবান্ধা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক উত্তম কুমার বলেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকায় অবৈধ ভাটা উচ্ছেদে ম্যাজিস্ট্রেটদের পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সারা দেশে মাত্র তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করেন। এরপরও জেলায় এ পর্যন্ত ছয়টি অবৈধ ইটভাটা থেকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে খামার ধুবনী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয় ভবন থেকে প্রায় ৮০ ফুট দক্ষিণে গড়ে উঠেছে ‘মেসার্স জে এস ব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটা। সেখানে অবৈধভাবে ইট পোড়ানো হচ্ছে। জিগজ্যাগ ভাটা থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কেউ ইট তৈরি করছেন, কেউ কাঁচা ইট পোড়ানোর স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যালয়ের মাঠ ঘেঁষে কাঁচা ইট রাখা হয়েছে। পাশে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। খামার ধুবনী গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া বলেন, ভাটার কালো ধোঁয়ায় বোরো ধানের বীজতলা ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছপালার পাতা লালচে হয়ে গেছে। ভাটার মালিক জিল্লুর রহমান বলেন, ভাটাটি অবৈধ হলেও স্থানীয় শ্রমিকেরা এখানে কাজ করে মজুরি পাচ্ছেন। প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো নোটিশ না পাওয়ায় ইট পোড়ানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিদ্যালয়টি স্থাপনের আগেই ভাটাটি গড়ে তোলা হয়। একই উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের কিশামত সর্বানন্দ গ্রামে গড়ে ওঠা কে এন এম ইটভাটার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ভাটাটি কিশামত সর্বানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। ভাটার মালিক মোখলেছুর রহমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ ছাড়া একই গ্রামে আধা কিলোমিটার দূরে এফ কে এম ইটভাটা।
ভাটাটি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে খাজেমুল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও আলহাজ ইমান উদ্দিন জামিউল হাফিজিয়া মাদ্রাসা অবস্থিত। ভাটার কারণে পাঠদান ব্যাহত ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে ভাটার মালিক মহিউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। গাইবান্ধা জেলা ভাটামালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফুল মিয়া বলেন, অবৈধ ভাটার কারণে বৈধ ভাটার মালিকেরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অবৈধভাবে কম দামে ইট বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধ ভাটামালিকদের সঙ্গে একই পরিচয়ে থাকতে লজ্জা লাগে। এসব ভাটা উচ্ছেদ করা জরুরি।
Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}