গাইবান্ধা শহর থেকে মাত্র ৭-১০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ফুলছড়ি উপজেলায় অবস্থিত বালাসী ঘাট। এ ঘাটের সাথেই প্রবাহিত যমুনা নদী। রাতের আঁধার কেটে একটু ফর্সা হলেই নদীতে একের পর এক ভাসতে থাকে জেলেদের নৌকা। এ যেন নদীতে ভেসে থাকা

জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। নদীর ঢেউয়ের ছলাৎছল শব্দে নৌকায় বসে কেউ জাল ফেলেন, কেউ বা জাল টেনে মাছ ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

 

একসময় এই নদী, নৌকা আর জলের সাথে ছিল একাত্মতা। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। নদীতে মাছ না থাকায় জেলেদের অনেকেই পেশা ছেড়েছে। এখনও যারা ধরে আছে তাদের কাছে এ পেশা যেন বাপ-দাদার পৈত্রিক পেশার গল্প।

 

সারাদিনের পরিশ্রম শেষে মাছ নিয়ে যখন তারা ঘাটে ফিরে আসে, তখন যমুনার হাওয়া যেন তাদের ক্লান্তি দূর করে দেয়। তাদের এ ক্লান্ত মুখ সবকিছুতেই যেন জড়িয়ে আছে নদীর গন্ধ।

 

সূর্য ডোবে, নদীর জলে লাল আভা পড়ে। এ সময় যুমনার দৃশ্যটা হয় অন্যরকম। নদী থেমে থাকে না তেমনি থেমে থাকে না জীবনের এই স্রোত। নৌকার পর নৌকা ছুটতে থাকে নদীর বুকে। তাতে জ্বলে মৃদু আলো। দূর থেকে মনে হয় যেন পানির ওপর বসে আছে এক টুকরো তারা ভরা আকাশ। এই আকাশের নিচে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা।

 

তবে জেলেদের এই জীবনের কষ্টও কম নয়। বর্ষায় যখন নদী ফুলে ওঠে, তখন ভাসমান এই নৌকাগুলোও ভাসে ভয়ের মধ্যে। অনেক সময় ঝড়ের রাতে নৌকা ভেসে যায়, কারো জীবনও হারিয়ে যায় এই জলে। তবুও জীবন থেমে থাকে না তারা হাসছে, তারা লড়ছে। কারণ তাদের কাছে জীবন মানে নদীর স্রোতের মতো যত বাঁধাই আসুক, থেমে থাকা নয়।

 

একসময় এই যমুনাপাড়ের জেলে সম্প্রদায়ের জীবন ছিল রঙিন, সুখ, সাচ্ছন্দময়। তারা ঘুরে ঘুরে নৌকা বেয়ে মাছ ধরত, তাদের গানে গানে নদী যেন

জীবন্ত হয়ে উঠত, জীবনের সুখ-দুঃখের উপেক্ষার কথা শোনাতো এবং জেলেদের বুকে অবারিত প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তুলতো। তাদের ভাটিয়ালি সুরে নদীর শান্ত রূপ, মাছ ধরার ব্যস্ততা, জাল ফেলার ছন্দ তাদের জীবন সংগ্রামের চিত্র ফুটে ওঠতো। এই গান যেন ছিল নদীপাড়ের জেলেদের প্রতিদিনের লড়াই ও আনন্দের দলিল।

 

যমুনা পাড়ের জেলেদের এই নৌকাগুলো বিলাসী জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, কিন্তু তারা জীবনের আরেকটা সত্য শেখায়- ঘর মানে চার দেয়াল নয়, যেখানে নদী ভালোবাসে, সেখানেই তাদের ঠিকানা।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}