মৃধা বেঙ্গলি কালচারাল সেন্টারএর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজন করা হয় “অমর একুশে” শীর্ষক এক হৃদয়ছোঁয়া ও সুশৃঙ্খল দুই পর্বের অনুষ্ঠান। প্রবাসের মাটিতে ভাষা শহীদদের স্মরণে এ আয়োজন যেন হয়ে উঠেছিল ইতিহাস, আবেগ ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক সেতুবন্ধন।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে। কেন্দ্রের চিফ কো-অর্ডিনেটর মৃদুল কান্তি সরকারের সঞ্চালনায় বক্তব্য প্রদান করেন মৃত্তিকা সরকার। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য ও ইতিহাসভিত্তিক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন। পরবর্তীতে কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ দেবাশীষ মৃধা ও চিনু মৃধা ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং প্রবাসে বাংলা ভাষা চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয় ডাঃ সুলতানা গজনভীকে। একইসঙ্গে গত বছরের ১ম মিশিগান বইমেলায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে সার্টিফিকেট ও স্যুভেনির তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ছিলেন মৃদুল কান্তি সরকার, চিন্ময় আচার্য্য, পূর্ণেন্দু চক্রবর্তী অপু, কমলেন্দু পাল, সৌরভ সরকার, শামীম শহীদ, মৌসুমী চক্রবর্তী, মৌসুমী দত্ত, রাজর্শী চৌধুরী গৌরব, তন্ময় আচার্য্য, অমিতা মৃধা ও মৃত্তিকা সরকার।

পরবর্তী পর্বে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক আয়োজন, যা সঞ্চালনা করেন মৌসুমী চক্রবর্তী। নাটিকা, পুষ্পস্তবক অর্পণ, কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক সংগীত, নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনার সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ। মৌসুমী চক্রবর্তীর রচনায় মঞ্চস্থ নাটিকায় অভিনয় করেন সংগীতা পাল ও শিশুশিল্পীরা; নেপথ্যে কণ্ঠ দেন অনন্ত সাইফ ও পপি দাস।

নটরাজ শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীতসহ একাধিক দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়। শিল্পীদের আন্তরিক পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। ছোটদের কণ্ঠে “একুশের ছড়া” ছিল বিশেষ আকর্ষণ।
আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাহীন ইসলাম, সাইফ সিদ্দিকী, পপি দাস, লিসা জামান, রূপা ভট্টাচার্য ও তন্ময় আচার্য্য যা অনুষ্ঠানে এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে।

দ্বৈত নৃত্যে মাহিকা সরকার ও স্পৃহা দাস দর্শকদের মুগ্ধ করেন। একক ফিউশন নৃত্যে মৃত্তিকা সরকার ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নৃত্যের ভাষায় তুলে ধরেন—যেখানে “আমি বাংলায় কথা কই” ও “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” স্লোগান নতুনভাবে প্রাণ পায়। এছাড়াও অন্তরা অন্তি ও আমারা তাদের নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন।

বাংলা স্কুল অব মিউজিক-এর শিক্ষার্থীদের সমবেত সংগীত ছিল অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ। লাকি পাল, শ্রেয়শী রায়, প্রজিতা বিশ্বাস, প্রমিতা বিশ্বাস, পুষ্মিতা বিশ্বাস, সুহানি দাস, দেবর্ষি রায় ও অদিতি রায়ের পরিবেশনায় গানগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। তবলায় সঙ্গত করেন প্রণবিন্দু বিশ্বাস। অনুষ্ঠানের শেষভাগে রূপা রায়ের কণ্ঠে “ও আমার বাংলা মা তোর” সমাপনী সংগীত হিসেবে পরিবেশিত হলে উপস্থিত সবার হৃদয়ে এক অনির্বচনীয় আবেগের সৃষ্টি হয়। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বাংলা সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকারের প্রকাশ। নতুন প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে—প্রবাসেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শিকড় দৃঢ় ও জীবন্ত। “অমর একুশে”র এই আয়োজন আবার স্মরণ করিয়ে দিল
ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়, ভাষা আমাদের সত্তা, আমাদের ইতিহাস, আমাদের আত্মার অনুরণন।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}