সম্প্রতি দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি বক্তব্য-“মানুষকে ডাক্তারের পিছনে নয়, ডাক্তারই মানুষের পিছনে যাবে”-নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকে এটিকে অবাস্তব বা আবেগপ্রসূত মন্তব্য হিসেবে দেখেছেন।
আবার কেউ বা সম্মানীত চিকিৎকগণকে ছোট করা হয়েছে বলে মনে করছেন । তবে একজন সমাজকর্মী ও জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী হিসেবে আমি মনে করি, বক্তব্যটি সরল অর্থে নয়, বরং রূপক অর্থে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনো অপর্যাপ্ত। শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে বঞ্চিত। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই; আবার যেখানে আছেন, সেখানেও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি তাঁদের দীর্ঘস্থায়ীভাবে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করে। এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্যকে আমরা এমন একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখতে পারি, যেখানে রাষ্ট্র চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সমতাভিত্তিক পদায়ন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
“ডাক্তার মানুষের পিছনে যাবে”-এর আরেকটি তাৎপর্য হলো, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। আধুনিক জনস্বাস্থ্য দর্শনে কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা, মোবাইল ক্লিনিক, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র জোরদার করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর টেলিমেডিসিনের প্রসার-এসবই সেই লক্ষ্য পূরণের কার্যকর মাধ্যম। স্বাস্থ্যব্যবস্থা তখনই মানবিক হয়, যখন রোগীকে সেবা পেতে ঘুরে বেড়াতে হয় না; বরং সেবাই তার কাছে পৌঁছে যায়।
তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালেই সম্ভব নয়। আমরা ক্লিনিক্যাল সেবাকে যতটা গুরুত্ব দিই, ঠিক ততটাই গুরুত্ব দিতে হবে জনস্বাস্থ্য ও সচেতনতাকে। রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা-এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ালে রোগীর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমবে। দীর্ঘ দিন মাঠ পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় থেকে বলতে পারি, একজন রোগীর চিকিৎসায় যে অর্থ ব্যয় হয়, সেই অর্থ যদি রোগ সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ব্যয় করা যায়, তবে হাজারো মানুষকে রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
এছাড়া হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের উপর অস্বাভাবিক রোগীচাপ কমাতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। রোগীর মানসিক দিক বিবেচনায় রেখে “রোগী কাউন্সেলর” নিয়োগ সময়ের দাবি। অনেক সময় রোগীর অসন্তোষ বা চিকিৎসক-রোগী দ্বন্দ্বের মূল কারণ তথ্যের অভাব ও যোগাযোগের ঘাটতি। একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর রোগীকে তার অবস্থা, চিকিৎসাপদ্ধতি ও প্রত্যাশিত ফল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেন, যা আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আমরা তর্ক বা মতবিরোধ চাই না; আমরা চাই একটি মানবিক, সুশৃঙ্খল ও আস্থাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিরাপত্তা ও স্বস্তি অনুভব করবে। শুধু রোগ নিরাময় নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
স্বাস্থ্যখাত একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার প্রতিচ্ছবি। রোগী, ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী-সবার সম্মিলিত প্রয়াস এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে একটি টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা। আমরা আশাবাদী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিত ও সন্তোষজনক নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এমন এক স্বাস্থ্যব্যবস্থা উপহার দেবেন, যা হবে আমাদের সবার গর্বের।
-মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
চাইল্ড এ্যান্ড মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর (ট্রেনি)