গাইবান্ধার চরাঞ্চলের লাল মরিচ বা শুকনো মরিচের কদর ও চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে। লাল টুকটুকে মরিচে সাজানো বস্তায় কানায় কানায় ভরে উঠেছে ফুলছড়ির ঐতিহ্যবাহী পাইকারি হাট। ব্রহ্মপুত্র সংলগ্ন এ হাটে লাল মরিচের গন্ধের পাশাপাশি সেখানেও ভর করেছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের থাবা। প্রতি সপ্তাহে কোটি টাকার লেনদেন হলেও, বেচা-কেনার নেই কোনো সাইনবোর্ড। প্রতি হাটে প্রায় ৮শ থেকে ১ হাজার মণ মরিচ কেনাবেচা হলেও বর্তমানে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অনিয়ম আর ইজারাদারদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ধ্বংস হতে চলছে হাটটি।

 

সরকারি নির্ধারিত মণ প্রতি ১০ টাকা খাজনা, হাটের ইজারাদার নিচ্ছে ৮০ টাকা, লেবার খরচ, ওজন করা কেজিতে ২ টাকা, ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের ১ মণ মরিচের হাটের খরচ গুনতে হয় ৬শত টাকারও বেশি যা কয়েকগুণ বেশি খাজনা নেয় ইজারাদার। শুধু তাই নয়, কৃষকদের জন্য ‘খাজনা ফ্রি’র আড়ালে চলছে অভিনব এক লুটপাট। ওজনে প্রতি মণে ১ কেজি করে মরিচ রেখে দিচ্ছেন ইজারাদাররা। বর্তমান বাজার দরে যার মূল্য প্রায় ৩০০ টাকা। অর্থাৎ, মুখে খাজনা নেই বললেও কৌশলে কৃষকের পকেট থেকে ৩০০ টাকাই হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চরের তপ্ত বালুতে মরিচ ফলানো কৃষকরা আজ ইজারাদারদের এই ‘মরণফাঁদ’ পড়ে তাদের ন্যায্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

প্রতিবছর সরকার এই হাট থেকে কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও এখানকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন শূন্যের

কোঠায়, নেই হাটের জায়গা, খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মরিচ কেনাবেচা করতে হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকারদের। গড়ে ওঠেনি পাইকারদের জন্য থাকার ব্যবস্থা। সাবেক জেলা প্রশাসক ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিলেও তা আজও ফাইলবন্দি। এমনকি শৌচাগার তৈরির কাজ শুরু হলেও সেটি এখন পরিত্যক্ত এক ভুতুড়ে দালানে পরিণত হয়েছে, যা হাটের চরম অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি সরকারি রেট চার্ট অনুযায়ী খাজনা আদায় নিশ্চিত করতে হবে, সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে প্রশাসনিক কঠোরতায়।

 

চর পিপুলিয়া গ্রামের মরিচ চাষী কালু শেখ জানান, চরের উৎপাদিত মরিচ ঘোড়ার গাড়ী ও নৌকায় করে ফুলছড়ি হাটে নিয়ে যেতে হয়। হাটে মরিচ বিক্রি করতে অতিরিক্ত খাজনাও দিতে হয়। পরিবহন ভাড়া ও খাজনা দিতেই আমাদের লাভ চলে যায়। এই জন্য প্রতিটি হাটে সরকার নির্ধারিত খাজনা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

 

বগুড়া থেকে ফুলছড়ি হাটে মরিচ কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম জানান, আমরা প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে মরিচ কিনতে আসি, কারণ এখানকার মরিচগুলো ভালোমানের। খাজনা ও পরিবহন খরচ বেশি হলেও এই মরিচ বিভিন্ন কোম্পানির নিকট বিক্রি করে খরচটা মেকাপ করা যায়। তবে হাটে দুরের ক্রেতাদের থাকার ব্যবস্থা ও খাজনা কম রাখলে ভালো হয়।

 

ফুলছড়ি হাট ইজারাদার ওহিদুল ইসলাম জয় জানান,

আমরা ১৮ বছর পর হাতে পেয়েছি এই হাট। এর আগে

আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজনের হাতেই ছিল। তারা মণপ্রতি ৮০ টাকা খাজনা ও হাপ কেজি মরিচ রেখে দিতেন। সেই অনুযায়ি আমরাও খাজনা আদায় করছি।

 

ঐতিহ্যবাহী এই হাটের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং চরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় এখন সময়ের দাবি প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ। সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরকারি রেট চার্ট অনুযায়ী খাজনা আদায় নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান প্রয়োজন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেই কেবল রক্ষা পাবে উত্তরের এই অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং স্বস্তি ফিরবে মরিচ চাষিদের মধ্যে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}