ব্যস্ততম শহর গাইবান্ধা। যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের কোলাহল, তীব্র যানজট আর যানবাহনের হর্ণের শব্দ এক অবিরাম যন্ত্রণার নিঃশ্বাস। এই শহরের নরম কোমল স্বপ্নগুলো ভেঙে যাবার শব্দে রাতগুলো কারো কাছে হয়ে ওঠে দুর্বিষহ, কেউবা নতুন করে স্বপ্ন সাজায় বেঁচে থাকায় আশায়। এই শহরের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশেই প্রতিদিন চোখে পড়ে এক অসহায় নারী। সঠিক নাম কারো জানা না থাকলেও বস্তা পাগলী নামে সবার কাছে পরিচিত।

চারপাশে কোলাহল, ভীড় আর ব্যস্ততা এখানো তার অপেক্ষার যেনো শেষ নেই। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে রাস্তার ফটপাত-ই যেনো তার বাড়ি যেন তার ঠিকানা, আকাশ-ই একমাত্র ছাদ। তার জন্য নেই কোনো নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা। তিনি ভিক্ষাবৃত্তিও করেন না। ফলে অনেক সময় তাকে না খেয়েই দিন পার করতে হয়। কেউবা সামান্য খাবার দিচ্ছেন, কিন্তু কেউ-ই জানেন না তার স্থায়ী ঠিকানা। প্রশ্ন করলেও কথা বলেন কম।

দিনের ভিড় ফুরায়, আলো নিভে আসে। শহরের সব মানুষ যখন ঘরে ফেরে, তিনি রয়ে যান একাকী, খোলা আকাশের নিচে। রাতের ঠান্ডা কিংবা গরম বাতাস তার ক্লান্ত শরীরকে আরও দুর্বল করে দেয়। মাটিই তার একমাত্র শয্যা। এক সময় যে বাবার ভালোবাসায়, মায়ের স্নেহ মমতায় বড় হয়েছে আজ তার ভাগ্যে শুধুই একাকিত্ব।

এই করুণ দৃশ্য দেখলে প্রশ্ন জাগে, এখানে কেনো তার দীর্ঘক্ষণের অপেক্ষা? সত্যিই কি কেউ নিতে আসবেন তাকে? নাকি এটি শুধু এক প্রতীক্ষার গল্প? তিনি হয়তো মনে মনে গুণছেন—আর কতদিন বাকি, এই পৃথিবীর মায়া কাটতে?

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার শরীর ও পোশাকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক তাই দিনের বেলায় অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু দিনের ভিড় ফুরিয়ে যখন আলো নিভে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, পরিস্থিতি হয়ে যায় ভিন্ন। এমন অন্ধকারের সুযোগে কিছু নরপিশাচের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানিসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার এই অসহায়ত্ব জীবনযাপনের ঘটনা অনেকের নজরে এলেও এখনো মেলেনি কোনো কার্যকর উদ্যোগ।

স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী, তিনি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন নন। তাই দিন শেষে রাত গভীর হয়ে
চারপাশের কোলাহল যখন নীরব হয় তখন তার মনের ভেতর অসংখ্য শব্দ জেগে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরোনো স্মৃতি, না বলা কথা আর চাপা রাখা কষ্ট। কখনও কখনও তিনি হয়ত মনে করেন, রাতটাই একমাত্র বন্ধু, যে নিরবে পাশে বসে থাকে, শুনে নেয় সব অব্যক্ত ব্যথা, সব হারানোর গল্প।

হয়ত এই নীরবতার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন, তিনি আসলে কতটা একা, কতটা হারিয়ে গেছেন নিজের ভিতরে। রাতের অন্ধকার যেমন ঢেকে রাখে শহরকে, তেমনি ঢেকে থেকে তার পাওয়া না-পাওয়ার হাহাকার..!!

যাদের আপনজন বা স্থায়ী বাসস্থান নেই, রাস্তাঘাটই তাদের নিত্যদিনের আশ্রয়। সেখানে তাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেয়ার মতো কেউ থাকে না। এ যেন নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবার অসহ্য যন্ত্রণার এক প্রতীক।

পরিশেষে, তিনি বস্তা পাগলি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি একজন নারী। তিনি আমাদের সমাজের মানবিকতার একটি কঠিন পরীক্ষা। শহরের মাঝখানে বছরের পর বছর ধরে একজন নারী যদি এভাবে অবহেলা ও অনিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করেন, তবে তা নিঃসন্দেহে আমাদের সামষ্টিক দায়িত্বের প্রশ্ন তুলে দেয়।

এখন তার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা,
নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা সহায়তাসহ স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। যাতে অন্তত একটি জীবন নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা ফিরে পায়। প্রয়োজন প্রশাসন, সমাজসেবী সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}