মঞ্চের জাঁকজমক ছাড়াই একান্ত নিজেদের আয়োজনে ‘বাহা পরব’ বা ফুল উৎসবের মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নিয়েছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাজাবিরাট সাঁওতাল পল্লীর বাসিন্দারা।

আদিবাসী সাঁওতালদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই রাজাবিরাট মানঝি পরিষদ এ উৎসবের আয়োজন করে। গতকাল রোববার আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি ও আদিবাসী নেতা ব্রিটিশ সরেন।

দুপুর থেকে প্রকৃতি পূজা ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে মাথায় ফুল গুঁজে সাঁওতাল নারী, পুরুষ ও শিশুরা নেচে-গেয়ে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেন।

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছে ‘বাহা’ তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব, যা ‘সাঁওতালি বসন্ত উৎসব’ নামেও পরিচিত।
সাঁওতালি ভাষায় ‘বাহা’ শব্দের অর্থ ফুল এবং ‘পরব’ মানে উৎসব। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমার পর থেকে এই উৎসব পালন করা হয়।

ব্রিটিশ সরেন জানান, প্রকৃতি পূজা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফুল বিতরণ, নাচ-গান এবং ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘হাঁড়িয়া’র মাধ্যমে অতিথি আপ্যায়ন ও খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এই উৎসব চলে।

আয়োজকদের একজন শ্যামবালা হেমব্রম জানান, এ উৎসবে প্রকৃতির নতুন ফুল প্রথমে দেবতার চরণে অর্পণ করা হয়। এরপর সাঁওতাল নারীরা সেই ফুল নিজেদের খোপায় গোঁজার অনুমতি পান।

উৎসবে শাল ও মহুয়া ফুলের ব্যবহারের প্রাচীন প্রথা থাকলেও স্থানীয় এলাকায় এসব গাছ না থাকায় অন্য ফুল দিয়েই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।

ব্রিটিশ সরেন বলেন, ‘সাঁওতালদের সামাজিক জীবন গঠন ও প্রকৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যেই এই উৎসব। বন-জঙ্গল থেকেই আমরা জীবন ধারণের রসদ পাই, তাই আমরা প্রকৃতির পূজা করি।’

তবে আয়োজকরা আক্ষেপ করে জানান, সামর্থ্য না থাকায় এখন আর আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণভাবে উৎসব পালন করা সম্ভব হয় না। সাঁওতালদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের অতিথি ও গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির তনু বলেন, ‘সংস্কৃতি ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উচিত সব ধর্মের ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করা। বাহা উৎসব একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাষ্ট্র যদি এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিগুলো রক্ষায় এগিয়ে না আসে, তবে আগ্রাসী সংস্কৃতির চাপে একসময় এগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী প্রামাণিক, মানবাধিকারকর্মী মনির হোসেন সুইট, হাসান মাহমুদ দীপন ও গোবিন্দগঞ্জ সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ডা. ফিলিমন বাস্কেসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}