অদম্য মেধা, পরিশ্রম আর অটুট স্বপ্নই পারে একজন মানুষকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে—তার উজ্জ্বল উদাহরণ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মাছনা গ্রামের কৃতি সন্তান ড. আমির হামজা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত Columbia University-এ পোস্টডক্টরাল সায়েন্টিস্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন। চলতি বছরের ১৬ মার্চ থেকে তার এই নতুন একাডেমিক ও গবেষণা যাত্রা শুরু হয়েছে, যেখানে তিনি টানা পাঁচ বছর গবেষণার সুযোগ পাবেন।

ড. হামজার গবেষণার নতুন ক্ষেত্র ক্যান্সার ইমিউনোলজি—বিশেষ করে ফুসফুসের ক্যান্সারে টিউমার-বিরোধী বি ও প্লাজমা কোষের অনাক্রম্যতা নিয়ে। তার এই গবেষণা ভবিষ্যতে ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা।
১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করা ড. হামজা মণিরামপুর উপজেলার মাছনা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক খায়বার আলী ও গৃহিনী জাহানারা বেগমের সন্তান। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই তার মেধার স্বাক্ষর মেলে—বলিয়াডাঙ্গা খানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি অর্জন এবং পরবর্তীতে বাহির ঘোরিয়া গোপালপুর আলিম মাদ্রাসা থেকে অষ্টম শ্রেণিতেও বৃত্তি লাভ করেন।
তিনি দাখিল সম্পন্ন করেন লাউড়ী রামনগর কামিল মাদ্রাসা থেকে এবং এইচএসসি করেন Government M. M. College থেকে। পরবর্তীতে Islamic University, Kushtia থেকে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে তিনি পাড়ি জমান দক্ষিণ কোরিয়ায়, Hallym University-এ। সেখানে “ক্যান্সার ও ম্যাক্রোফেজ কোষের পারস্পরিক ক্রিয়া এবং টিউমার মাইক্রোএনভায়রনমেন্টে তাদের ভূমিকা” বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। তার গবেষণালব্ধ ফলাফল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল Free Radical Biology and Medicine-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে নেচার পাবলিশিং গ্রুপের Communication Biology-তেও তার গবেষণা প্রকাশিত হয়ে বিশ্ববিজ্ঞানের অঙ্গনে তাকে আরও পরিচিত করে তোলে।
ড. হামজার গবেষণাজীবন শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি National Institute of Biotechnology-এ গবেষণা করে প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার সহধর্মিণী শামসুন নাহার জলি বর্তমানে হালিম ইউনিভার্সিটিতে বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর করছেন এবং ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ড. হামজার বড় ভাই ব্যবসায়ী আলী রেজা বলেন,
আমার ভাই ছোটবেলা থেকেই স্বপ্নবাজ ছিল। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সে কখনো থেমে যায়নি। আজ তার এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের নয়, পুরো মণিরামপুরবাসীর গর্ব। আমরা বিশ্বাস করি, তার গবেষণা একদিন মানবজাতির কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখবে। প্রতিবেশী শিক্ষক সায়ফুল আলম বলেন,আমির হামজা আমাদের এলাকার তরুণদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সে প্রমাণ করেছে—গ্রামের মাটি থেকেও বিশ্বমানের বিজ্ঞানী তৈরি হওয়া সম্ভব, যদি থাকে ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়। তার এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করবে।

দীর্ঘ সাত বছরের গবেষণাজীবন শেষে তিনি দেশে ফিরে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করলেও উপযুক্ত সুযোগের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে যোগদানের মাধ্যমে তিনি তার স্বপ্নপূরণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

ড. আমির হামজার এই অনন্য সাফল্যে গর্বিত মণিরামপুরবাসী। তার আগামীর পথচলা আরও উজ্জ্বল হোক—এমন প্রত্যাশা সবার।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}