একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নতুন একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটছিল, তখন গাইবান্ধার নিভৃত জনপদগুলো ছিল স্বজন হারানো মানুষের কান্নায় ভারাক্রান্ত। উত্তরের এই জনপদটি দীর্ঘ নয় মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর যে পৈশাচিক বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছে, তার ক্ষত আজও শুকায়নি।
ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা আর যমুনার পলিবিধৌত এই উর্বর মাটির গভীরে মিশে আছে হাজারো নাম না জানা শহিদের হাড়গোড়। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও গাইবান্ধার অধিকাংশ বধ্যভূমি ও গণকবর আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হয়নি।
হালনাগাদ চিত্র বলছে, জেলার ৪৩টি প্রধান বধ্যভূমি ও গণকবরের মধ্যে অন্তত ২৫টিই এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। অনেক স্থানে ইতিহাসের এই পবিত্র স্মারকগুলো আবর্জনা ফেলার স্তূপে কিংবা প্রভাবশালী মহলের দখলে পর্যবসিত হয়েছে, কোথাও বা রক্তস্নাত জমিতে চলছে ফসলের চাষ।
গাইবান্ধা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শাহ আবদুল হামিদ স্টেডিয়াম (বর্তমানে গাইবান্ধা জেলা স্টেডিয়াম) সংলগ্ন বধ্যভূমিটি ইতিহাসের এক করুণ পরিহাসে পরিণত হয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা তৎকালীন হেলাল পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) ঘাঁটি গেড়ে, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞসহ নারী নির্যাতন চালিয়ে লোকজনকে এখানে মাটিচাপা দিত।
সরেজমিন চিত্রে দেখা যায়, বধ্যভূমির চারদিকে ইটের প্রাচীর থাকলেও ভেতরে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই বরং পুরো জায়গাটি আগাছায় ভরে গেছে এবং সেখানে ফসলের চাষ করা হচ্ছে । এই স্থানটিতে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার ‘শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিলো। তবে জেলার সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটি তার তীব্র বিরোধিতা করে।
তাদের মতে, শহিদের রক্তের ওপর কোনো বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ করা ইতিহাসের চরম অবমাননা। জেলা বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটির পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করার ফলে বর্তমানে এই জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে আছে।
শহরের স্টেডিয়াম সংলগ্ন ওই বধ্যভূমি (কফিল শাহর গুদাম) ছিল একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় নরককুণ্ড,
যেখানে মানুষ জীবিত ঢুকলেও মৃত হয়ে বের হতো। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী এই গুদাম ঘরকে নির্যাতন সেল হিসেবে ব্যবহার করত এবং গুলি খরচ না করে অনেককে ইটের ওপর আছড়ে থেঁতলে হত্যা করা হতো। স্বাধীনতার পর এখান থেকে রক্তমাখা ইট এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের ব্যবহার্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু আজও এই গুদাম চত্বরটি বধ্যভূমির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়নি এবং এখানে কোনো স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি।
একইভাবে সদর উপজেলার কামারজানি বধ্যভূমিটি বর্তমানে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দখলে। বাজারের দক্ষিণে যেখানে এক সময় আর্মি ক্যাম্প ও বধ্যভূমি ছিল, সেখানে এখন বসানো হয়েছে কাঠ চেরাইকল । শহিদের বুকের ওপর দিয়ে চেরাই হওয়া কাঠের গুঁড়ো যেন প্রতিনিয়ত রক্তের স্মৃতিকেই উপহাস করছে।
জেলা শহর থেকে দূরে পলাশবাড়ী উপজেলার কাশিয়াবাড়ী বা ‘পশ্চিম রামচন্দ্রপুর বধ্যভূমি ৭১’-এর অবস্থা আরও শোচনীয়। বধ্যভূমিটি বর্তমানে একটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ২০০৫ সালে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর লোহার দরজা চুরি হয়ে যায়। বধ্যভূমির ভেতরটা যত্রতত্র মলমূত্র এবং ময়লা-আবর্জনায় ভরা; চারদিকের দুর্গন্ধময় পরিবেশে সেখানে গবাদিপশু বেঁধে রাখা হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই ভেতরে পানি জমে থাকে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নেই।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্ষেপ, গত পাঁচ বছর ধরে স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসে সেখানে কোনো আলোচনা সভা বা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধানুষ্ঠান আয়োজন করা হয়নি।
জাতীয় পর্যায়ে বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালে ৪৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত এর অগ্রগতি হতাশাজনক। দেশজুড়ে ২৮১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণের এই প্রকল্পে ২০২১ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে, কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ। গাইবান্ধাসহ অনেক বধ্যভূমিতে জমিসংক্রান্ত জটিলতা এবং পর্যাপ্ত খাসজমির অভাবে কাজ শুরুই করা যায়নি। প্রতিটি বধ্যভূমির জন্য গড়ে ৮০ লাখ ৯২ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বধ্যভূমিগুলো কেবল মাটির স্তূপ নয়, এগুলো একেকটি পরিবারের বিষাদময় ইতিহাস। গাইবান্ধার কলেজ রোডের বাসিন্দা পরেশ নাথ প্রসাদকে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা ধরে এনে এই স্টেডিয়াম বধ্যভূমিতেই হত্যা করেছিল। তার স্বজনরা আজও সেই বধ্যভূমির পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবার শেষ স্মৃতি হাতড়ান। রাষ্ট্র যখন এই বধ্যভূমিগুলোর মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই স্বজনদের বেদনা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
গবেষকদের মতে, পাকিস্তানিরা মানুষকে শারীরিকভাবে হত্যা করেছিল আর বর্তমানের এই অবহেলা ও দখলদারিত্ব সেই শহিদের স্মৃতিকেই হত্যা করছে।
গাইবান্ধার ৪৩টি বধ্যভূমিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সংরক্ষণ করা এখন কেবল সময়ের দাবি নয় বরং এক জাতীয় দায়বদ্ধতা। এই নীরব সাক্ষীগুলো যদি হারিয়ে যায়, তবে আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়বে। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় বর্তমান প্রজন্মকে একদিন অবশ্যই অপরাধী হিসেবে জবাবদিহি করতে হবে।