ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত বিশ্ব রাজনীতির নগ্ন বাস্তবতাকে আবারও উন্মোচিত করেছে। মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব—এসব শব্দ শুধু দুর্বল দেশগুলোর জন্য; শক্তিধরদের জন্য নয়—এই সত্য আজ আর লুকোনো নেই। বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নীতির কথা যত বলা হয়, বাস্তবে চলছে স্বার্থের নির্মম হিসাব। আর এই হিসাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি, সামরিক আধিপত্য এবং ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ছিল অনুমেয়। মুখে শান্তির কথা, ভেতরে নীরব সমর্থন। ইউরোপের দেশগুলো প্রথমে চুপ থেকেছে—কারণ তখন তাদের ক্ষতি হচ্ছিল না। কিন্তু যখন জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়ল, বাজার অস্থির হল, তখন তারা উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ মানবিকতার প্রশ্ন নয়, নিজের পকেটের হিসাবই শেষ পর্যন্ত তাদের নীতি নির্ধারণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকা আরও দ্বিমুখী। তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরোধী বিবৃতি দেয়, কিন্তু নিরাপত্তার নামে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি মেনে নেয়।

একদিকে জনগণের সামনে নিরপেক্ষতার অভিনয়, অন্যদিকে কৌশলগত সুবিধার জন্য নীরব সহযোগিতা—এই দ্বৈততা নতুন নয়। কিন্তু সংঘাত যখন তাদের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করল, তখনই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠল। নিরাপত্তার ছাতা যে সব সময় রক্ষা করতে পারে না, তা তারা হঠাৎ করেই বুঝতে শুরু করেছে। রাশিয়া ও চীনও নৈতিকতার পতাকা হাতে নামেনি। তারা হিসাব করছে—কিভাবে এই সংকট তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাভে ব্যবহার করা যায়। তেলের দাম বাড়লে কার লাভ, অস্ত্র বাজারে কার সুযোগ—এই ঠান্ডা মাথার অঙ্ক চলছে। বিশ্ব রাজনীতিতে আদর্শ নয়, সুযোগই শেষ কথা—এই সত্য আবারও সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা প্রায় অদৃশ্য। জাতিসংঘ, নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আদালত—এসব কাঠামো শক্তিধরদের ভেটোর কাছে বন্দি। যখন শক্তিধর রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে পদক্ষেপ নেয়, তখন এসব প্রতিষ্ঠান কেবল বিবৃতি দেয়; বাস্তব পদক্ষেপ নেয় না। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আস্থা ক্রমেই ক্ষয় হচ্ছে। এই সংঘাতের আরেকটি দিক হলো ভৌগোলিক নিরাপত্তার রাজনীতি।

যারা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের ভূখণ্ডে যুদ্ধের আগুন পৌঁছায় না। কিন্তু সংঘাতের কেন্দ্র হয় সেই অঞ্চল, যেখানে জ্বালানি সম্পদ রয়েছে। ফলে যুদ্ধের ঝুঁকি বহন করে অন্যরা, আর কৌশলগত সুবিধা নেয় দূরের শক্তিধররা। এই অসম বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। তেলের দাম বাড়ছে, পরিবহন খরচ বাড়ছে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব বাড়ছে। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত যারা নেয়, তারা নিরাপদ; কিন্তু এর অর্থনৈতিক অভিঘাত পড়ে দুর্বল অর্থনীতির ওপর। বিশ্ব অর্থনীতি যেন এক অদৃশ্য করের মুখে—যার নাম ভূরাজনৈতিক সংঘাত। এ

ই পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি সত্যিই ন্যায়ভিত্তিক? নাকি এটি শক্তিধরদের নিয়ন্ত্রিত এক অসম কাঠামো? ইরান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, নৈতিকতার ভাষণ যতই দেওয়া হোক, শেষ পর্যন্ত শক্তিই রাজনীতির নিয়ামক। আর সেই শক্তির খেলায় সাধারণ মানুষ, দুর্বল রাষ্ট্র ও উন্নয়নশীল অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বলি। যদি এই সংঘাত বিস্তৃত হয়, তাহলে এর প্রভাব সীমান্ত মানবে না। জ্বালানি বাজার থেকে খাদ্য নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা বাড়বে। ইতিহাস বলে, আঞ্চলিক সংঘাত অনেক সময় বৃহত্তর সংকটে রূপ নেয়। তাই প্রশ্ন এখন শুধু ইরান নয়; প্রশ্ন বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ—যেখানে নীতি নয়, স্বার্থই চূড়ান্ত সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}