গাইবান্ধা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম জেলা। মূল মহাসড়ক থেকে এই জেলা একটু বাইরে থাকায় কেউ কেউ এই জেলাকে পকেট জেলাও বলে থাকেন। বৃহত্তর রংপুর বিভাগের আওতায় দক্ষিণে এই জেলার ভৌগোলিক অবস্থান। জেলা শহরের প্রায় ১০ কিঃ মিঃ পূর্ব দিকের ফুলছড়ি উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী। জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা আর দক্ষিণে সাঘাটা উপজেলার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা নদী। এই সকল নদী জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ভূমিকে বিভক্ত করেছে। কোথাও কোথাও বিশাল আকৃতির বালুচর জেগে উঠে ব-দ্বীপ ভূমির সৃষ্টি হয়ে মূল সমতল ভুমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। জেলায় প্রায় ১৬৫টি ছোট বড় চরের প্রকাশ ঘটেছে। জেলার মূলতঃ সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি এবং সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের মধ্যে এই সকল চরের বিস্তৃতি। জেলার ১৬৫টি চরে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের বসবাস। সাক্ষরতার শতকরা হার ৬৬.৮৭%। স্বাধীন দেশের নাগরিকের অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার শিক্ষা। কিন্তু এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চরাঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থী। নদী বেষ্টিত এসব চরাঞ্চলে ১১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক স্কুল ও মাদরাসা নেই বললেই চলে।

মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১২টি এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩টি মাদ্রাসা। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদার তুলনায় এই কয়েকটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারেই কম।তারপর আবার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে । ১৬৫ দ্বীপ চরের বিশাল জনগোষ্ঠির জন্য একটিও কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরপরই অনেকের পড়াশোনা করা সম্ভব হয়ে উঠে না । কলেজ না থাকায় চরাঞ্চলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ঝরে পড়ছে অকালে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে জেলার সামগ্রিক শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর। শিক্ষার্থীরা অকালে ঝড়ে পড়ার কারণে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে বাল্যবিয়েসহ শিশুশ্রমে। জানা যায়, গাইবান্ধার চরাঞ্চলের ৩০-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী নানা কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। যারা ভর্তি হয় তাদের মধ্যে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নানা কারণে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। এর পিছনে দারিদ্র্যতা , চর এলাকায় পর্যাপ্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকা, এলাকার অভিভাবকদের অসচেতনতা, কষ্টসাধ্য যাতায়াত ব্যবস্থা এবং বাল্যবিবাহ অন্যতম।

চরাঞ্চলের অভিভাবকদের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে আর পড়াশোনার সুযোগ হয়ে উঠে না। এ বিষয়ে তারা বলছেন, এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। আবার নদী ভাঙ্গন ও দারিদ্র্যতার কড়াল গ্রাসে অনেকের অর্থনৈতিক অবস্থার বেহাল দশার কারণে তাদের সন্তানকে অন্য চরে বা শহরের স্কুলে পড়ানোর সাধ্য তাদের নেই । তবে যে অভিভাবকদের সামর্থ আছে, কেবল তারাই সন্তানদের শহরে আবাসিক হোস্টেল বা মেসে রেখে পড়াশুনা করাতে পারেন। তারা বলেন, চরের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী যথেষ্ট মেধাবী। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি বাংলাদেশের অনেক বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাইবান্ধার চরের শিক্ষার্থীদের বিচরণ রয়েছে। এ থেকে আমরা বলতেই পারি ইচ্ছে থাকলেও যেন উপায় মিলছে না। যেহেতু চরগুলো প্রায়ই নদীভাঙনের কবলে পড়ে সেক্ষেত্রে প্রতিটি চরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্থাপন করা হলে ওইসব এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের অকালে ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করা যেতো। যেহেতু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা। সামগ্রিকভাবে একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্যও সবার জন্য নিশ্চিত হোক শিক্ষার সমান সুযোগ। তাদের দাবী, বর্তমান সরকার সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রমকে যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে তেমনি চরাঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জন্যও সরকার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে পূর্ণতা দেওয়া অতীব জরুরী ।

চরাঞ্চলের একাধিক এসএসসি পরিক্ষার্থীর সাথে কথা হলে তারা জানায়, “আমাদেক চর থেকে এসে উপজেলার কালির বাজারে মেসে উঠে এস,এস,সি পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা শেষ হলে উচ্চ শিক্ষার জন্য কোথায় ভর্তি হবো তা জানা নেই। কারণ চরাঞ্চলে আমাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য কোন কলেজ নেই। আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থাও অস্বচ্ছল। তাই শহরে বা উপজেলা শহরে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালানোর টাকা জোগানো আমাদের পরিবারের জন্য খুবই কস্টকর ব্যাপার। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি চরাঞ্চলগুলোতে কলেজ স্থাপন করা হলে আমাদের মত শিক্ষার্থীরাও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা নিশ্চিত করতে চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত বিদ্যালয় স্থাপন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। দুই তিনটি চর এলাকার সাথে সমন্বয়ে মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হলে চরে উন্মোচিত হতে পারে শিক্ষার নতুন দিগন্ত। গাইবান্ধা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বদ্ধ পরিকর। চরাঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। যে কয়টি বিদ্যালয় আছে তা নদী তীর ঘেষে। আর যে চরগুলোতে মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করার উপযোগী সেই চরগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}