কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার একমাত্র ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিক প্রয়াত গঙ্গেশ সরকারের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী নিরবে নিভৃতে পারিবারিকভাবে পালিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল ২০২৬),বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর প্রথম দিন ১লা বৈশাখ উপলক্ষে উপজেলার দামিহা গ্রামে তাঁর নিজ বাসভবনে পারিবারিকভাবে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে প্রয়াত নেতাকে স্মরণ করা হয়।পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী উপস্থিত থেকে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের ১৪ এপ্রিল তাড়াইল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী প্রতিবছরই পারিবারিকভাবে পালন করা হলেও এবছরও একইভাবে সাদামাটা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়।
প্রয়াত গঙ্গেশ সরকার শৈশবকাল থেকেই দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘যুগান্তর’ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং বার্তাবাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন সংগ্রামী ও আপোষহীন। ১৯৪৬ সালে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুনরায় গ্রেফতার হন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৫৬ সালে ৯২(ক) ধারায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান।
১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ-এ যোগ দেন এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ও তিনি আটক হন।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির একজন বলিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। স্বাধীনতার পরও তিনি রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় থেকে জনগণের অধিকার আদায়ে কাজ করে যান। ১৯৭০-এর দশকে তিনি দামিহা ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক শাসনামলেও তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন শাসনামলে প্রায় দুই বছর ময়মনসিংহ কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে রাশিয়া সফরের সুযোগ পান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি উপমহাদেশের বহু প্রখ্যাত নেতার সান্নিধ্যে আসেন এবং বাম ধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তাঁর সহধর্মিণী প্রয়াত রেভা রানী সরকারের সহায়তা ও ত্যাগ তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরিবারটি এখনও তাঁর আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করে যাচ্ছে।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গঙ্গেশ সরকারের আজীবনের সংগ্রাম, দেশপ্রেম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
স্থানীয়দের মতে,উপজেলার একমাত্র ভাষাসৈনিক গঙ্গেশ সরকারের মতো ত্যাগী ও আদর্শবান নেতার জীবনসংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করবে। তাঁর স্মৃতি ও অবদান চিরকাল এলাকাবাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে।