কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত উপজেলা অষ্টগ্রাম। এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান ভিত্তি হচ্ছে বোরো ধান। হাজার হাজার কৃষক পরিবারের সারা বছরের ভাগ্য আর স্বপ্ন মিশে থাকে এই একটি ফসলের ওপর। কিন্তু প্রতি বছর আগাম বন্যা আর বৃষ্টির পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা অষ্টগ্রামবাসীর জন্য এখন নিয়মিত অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে যে ফসলহানির সংকট চলছে, তার স্থায়ী সমাধানের জন্য এখন দায়সারা বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত নদী ব্যবস্থাপনা।

​সংকটের গভীরতা ও কারণ:

অষ্টগ্রামের হাওরগুলোর বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে মূলত নদীগুলোর নাব্যতা সংকট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন। আকস্মিক অতিবৃষ্টির ফলে যে বিপুল পরিমাণ পানির প্রবাহ তৈরি হয়, নদীগুলো তা ধারণ বা নিষ্কাশন করতে পারছে না। দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে হাওরের ফসল তলিয়ে দিচ্ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।

​টেকসই সমাধানে নদী ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব:

অষ্টগ্রামের কৃষি অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে কেবল অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।

এর জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:

নদী খনন ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা: অষ্টগ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী ও শাখা নদীগুলো পরিকল্পিতভাবে খনন করতে হবে। নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বাড়লে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাবে এবং ফসলের মাঠ তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।

​২. পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ: হাওরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে নদী ও জলাশয়ের আন্তঃসংযোগ বজায় রাখা জরুরি। নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির প্রাকৃতিক গতিপথগুলো সচল করলে অকাল বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

​৩. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা ও পানি নিষ্কাশন: নদী ভরাট হওয়ার কারণে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা নিরসনে কৃষকরা নিজেদের খরচে পাম্প ব্যবহার করছেন। নদী খনন না হওয়া পর্যন্ত এই পানি নিষ্কাশনের যান্ত্রিক ব্যয়ভার সরকারকে বহন করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে দ্রুত আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

​৪. সমন্বিত ও সংবেদনশীল পরিকল্পনা: কৃষি অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে নদী শাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকিতে স্বচ্ছতা ফেরাতে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ ও সেনাবাহিনীর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নদী খনন ও ব্যবস্থাপনার কাজগুলো লোকদেখানো না হয়ে দীর্ঘমেয়াদী সুফল আনে।
সারকথা:
অষ্টগ্রামের হাওর বাঁচলে কিশোরগঞ্জ তথা দেশের কৃষি সমৃদ্ধ হবে। অস্থায়ী কোনো সমাধানের পেছনে না ছুটে নদী খনন ও আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই স্থায়ী সংকটের অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি অষ্টগ্রামের কৃষকদের জীবন-মরণ এই সমস্যার সমাধানে নদী শাসনে জোরালো ভূমিকা নেবেন?

লেখক: জুনাইদ মিয়া
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মৃত্তিকা বিজ্ঞান

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}