গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার অদম্য মেধাবী আয়শা আক্তার, যার জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পায়ের জোরে তিনি জীবনযুদ্ধে হার মানেননি। প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আয়শা সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের দরিদ্র কৃষক আব্দুল লতিফের মেয়ে। জন্ম থেকেই তার দু’টো হাত নেই। দরিদ্র ঘরে জন্ম হওয়ায় তার জীবনটা শুরু কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে কখনোই বাধা হতে দেননি তিনি। বরং প্রতিটি প্রতিকূলতাই তাকে করেছে আরও দৃঢ়, আরও আত্মবিশ্বাসী।

শৈশব থেকেই অবহেলা, করুণা আর অবজ্ঞা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এরই মধ্যে হারান তার বাবা দরিদ্র কৃষক আব্দুল লতিফকে। বাবার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে এক বিভীষিকাময় অন্ধকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই আকস্মিক শোকে থমকে যায় পরিবারের চাকা। মা মাজেদা বেগমের চোখে তখন একটাই ভয় তিনি না থাকলে মেয়েকে দেখবে কে? তবে মায়ের সেই ভয়কে শক্তিতে রূপ দিয়েছেন আয়শা নিজেই। তার লক্ষ্য একটাই একটি সম্মানজনক চাকরি, যা বদলে দিতে পারে পুরো পরিবারের জীবন।

দুটি হাত না থাকলেও থেমে থাকেননি তিনি। পা-ই তার হাত। পায়ের আঙুল দিয়েই করেন রান্না, ঘরের কাজ, এমনকি নানা ধরনের পরিশ্রমের কাজও। শুধু তাই নয়, পায়ের আঙুল দিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তিনি। আর তাতেও শিখেছেন কম্পিউটার পরিচালনাও যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

জানা যায়, শিক্ষাজীবনেও তিনি রেখেছেন সাফল্যের ছাপ। পায়ের আঙুলে কলম ধরে লিখেই ২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শুধু পড়াশোনা নয়, নিজেকে দক্ষ করে তুলতে শিখেছেন কম্পিউটার ও সেলাইয়ের কাজও। যেন সুযোগ এলেই নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন। চার বোনের মধ্যে তৃতীয় আয়শা। অন্য বোনেরা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিলেও আয়শা এখনো লড়ছেন নিজের জায়গা তৈরি করতে।

কথা হয় আয়শার মা সাজেদা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, জন্মের পর থেকে মেয়ে আয়শাকে নিয়ে চরম কষ্ট করেই আসছি। এত কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে লেখাপড়া করাইছি। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স পাশ করেছে আয়শা। তবে দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত একটা চাকরি হয়নি মেয়েটার। এখন একটা চাকরির খুবই প্রয়োজন। তাই প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

প্রতিবেশি অন্তর মিয়া জানান, আয়শা এক অদম্য নারী। যার কোনো তুলনা হয় না। শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করে স্বাবলম্বী হওয়াই তার প্রধান স্বপ্ন। তার একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড রয়েছে, যা থেকে প্রতি তিন মাস পর ২ হাজার ১০০ টাকা পান। “এই সামান্য সম্বলটুকুই তাঁর উচ্চশিক্ষার পাথেয় হয়েছিল, যার সহায়তায় তিনি সাফল্যের সাথে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।” চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করছে। তার একটা সরকারি বা বেসরকারি চাকরি খুবই প্রয়োজন। এতে ঘুচবে দুঃখ, সফল হবে তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির স্বপ্ন।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}