চট্টগ্রাম নগরীকে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতামুক্ত ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, “এই শহর শুধু মেয়রের নয়, এটি আমাদের সবার শহর। নগরকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।”

 

জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল সংস্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিয়ে বুধবার চসিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন।

 

মেয়র বলেন, নগরীর প্রতিটি স্কুলে স্কুল হেলথ প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিশুদের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতন করে তোলা হচ্ছে। শিশুদের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “আজকের প্রজন্ম যদি শিখে কোথায় ময়লা ফেলতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম হবে আরও পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য।”

 

ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই প্রকল্পের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ প্রতিদিন নানা খাতে অর্থ ব্যয় করলেও শহর পরিষ্কার রাখার জন্য মাসে ৭০ থেকে ১০০ টাকা দিতে অনীহা দেখায়। অথচ নগরীর পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”

 

তিনি আরও বলেন, অনেকেই ভুলভাবে এটিকে অতিরিক্ত কর হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এটি কোনো কর নয়, বরং বাসা থেকে নিয়মিত ময়লা সংগ্রহের বিপরীতে নির্ধারিত সেবামূল্য।

 

মেয়র দাবি করেন, সমন্বিত উদ্যোগের ফলে ২০২৫ সালে নগরীর বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় আগের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, “বদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় অতীতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলেও এবার সেই পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে ছিল।”

 

এ সময় তিনি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা, জেলা প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করেন।

 

তিনি বলেন, “গত বর্ষায় আমরা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমাতে সক্ষম হয়েছি। এবার আমাদের লক্ষ্য ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম উপহার দেওয়া।”

 

খাল সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, হিজড়া খাল, জামালখান খাল, রামপুরা খাল, গুলজার খাল, আজব বাহার খাল ও বামুনশাহী খালসহ বিভিন্ন খালের কাজ বন্ধ হয়নি; বরং ভারী বর্ষণের কারণে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। বর্ষা শেষে পুনরায় পুরোদমে কাজ শুরু হবে।

 

তিনি জানান, নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে এবং বাকি খালগুলোও পর্যায়ক্রমে সংস্কারের আওতায় আনা হচ্ছে।

 

প্লাস্টিক ও পলিথিনকে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, “নালা-নর্দমায় প্লাস্টিক জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীকেও দূষিত করছে।”

 

অবৈধ দখল ও ফুটপাতকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত ব্যবসার কারণেও নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।

 

সভায় মেয়র আরও জানান, নগরীর বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে হালিশহরে একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাশাপাশি জাপান ও কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে নগরীর দুটি ল্যান্ডফিল আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

তিনি বলেন, “পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সচেতনতা এবং সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।”

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}