দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সরকারি অনুমোদন পেল ‘ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ’। উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তবর্তী জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আশাবাদ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষা খাতে যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়।

গত ১৩ মে বুধবার স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঠাকুরগাঁও জেলায় ‘ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নতুন এই প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ায় দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৮টিতে। মেডিকেল কলেজের অনুমোদনের পাশাপাশি জেলায় একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের খবর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও যোগাযোগব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে এখন চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। জেলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের নির্মাণকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে অনুমোদন পেয়েছে একটি নার্সিং কলেজ। প্রশাসনিক সেবাকে মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে সদর উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লি’ নামে দুটি নতুন উপজেলা গঠনের ঘোষণাও এসেছে। ঘোষণার পর এলাকাজুড়ে আনন্দ মিছিল ও উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও এগোচ্ছে জেলা। বিসিক শিল্প নগরী-২ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে পুরোদমে। জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবিও নতুন গতি পেয়েছে। আগামী ২০ মে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পরিদর্শনের কথা রয়েছে। এ সফরকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের ধারণা, বিমানবন্দর চালু হলে উত্তরাঞ্চলের এই জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ঠাকুরগাঁও পৌরসভাকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। যানজট নিরসনে বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আনা হয়েছে শৃঙ্খলা। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার স্কুলহাট গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, “কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এবং সময়মতো কৃষি উপকরণ পাওয়া গেলে ঠাকুরগাঁও কৃষিতেও আরও এগিয়ে যাবে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন ও জেলা তথ্য অফিস আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও অবকাঠামো—সব খাতেই ঠাকুরগাঁও এখন এগিয়ে যাচ্ছে।” সাবেক অধ্যক্ষ সৈয়দ মেরাজুল হোসেন বলেন, “মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমানবন্দর চালুর দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছি। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবের পথে।”

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট মৌসুমি রহমানের ভাষ্য, “উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা।” বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঠাকুরগাঁও উত্তরাঞ্চলের অন্যতম শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}