সকাল তখন ঠিক ৮টা। গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে চলেছেন ৭৫ বছর বয়সী মফিজ উদ্দিন। বয়সের ভারে তার কোমরটা কিছুটা বেঁকে গেছে, চোখের কোণে জমেছে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু তবুও থেমে নেই তিনি। ডান হাতে জং ধরা কাঁচি আর পিঠের ওপর ঝোলানো সবুজ ঘাসভর্তি বস্তা। বয়সের এই পড়ন্ত বেলায় বিশ্রাম নেওয়ার কথা থাকলেও, সংসারের মায়া আর গবাদিপশুর খাবারের চিন্তায় তাকে প্রতিদিন ছুটতে হয় দিগন্তের মাঠে।

 

মফিজ উদ্দিন গাইবান্ধা সদর উপজেলার নিভৃত পল্লী লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত ছফের উদ্দিনের পুত্র। নিম্নবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। জীবনের যৌবনকাল কেটেছে হাড়ভাঙা খাটুনি আর সংসারের ঘানি টেনে। এখন তার শরীর আর আগের মতো চলে না। রোগে-শোকে জীর্ণ শরীর নিয়ে প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে তাকে ছুটতে হয় দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে। সন্তানেরা বড় হয়ে নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত থাকলেও, বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিনের কাঁধ থেকে দায়িত্বের বোঝা নামেনি। আজও তার ওপর নির্ভরশীল তার নিজের সংসার এবং লালন-পালন করা গবাদিপশুগুলো।

 

মাঠের পর মাঠ ঘুরে যখন তিনি কাঁচি দিয়ে এক মুঠো এক মুঠো করে ঘাস কাটেন, তখন তার মনে ভেসে ওঠে অতীতের বহু স্মৃতি। একসময় শক্ত হাতে হাল চাষ করা এই হাতগুলো এখন কাঁপে, তবুও পিঠের বস্তাটি ভারী হতে থাকে। স্থানীয়রা জানান, মফিজ চাচার এই অদম্য চেষ্টা আর গরুর প্রতি মায়া দেখে অনেকেই অবাক হন। তিনি যেন শেখান, দায়িত্ব ও ভালোবাসা বয়স বা শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না।

 

গরুগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসেন তিনি। তাদের অভুক্ত রাখা তার পক্ষে অসম্ভব। তাই নিজের শারীরিক অসুস্থতাকে জয় করে, তীব্র রোদের মধ্যেও তিনি ছুটে যান ঘাসের সন্ধানে। পিঠে ঘাসের বস্তা নিয়ে যখন তিনি বাড়ির দিকে রওনা হন, তখন তার মুখের ক্লান্তির আড়ালে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। সংসার ও প্রিয় প্রাণীদের প্রতি তার এই অকৃত্রিম মায়া সমাজের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

 

মফিজ উদ্দিনের জীবনের প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ত্যাগের গল্প। হাতে কাঁচি আর পিঠে বস্তা নিয়ে তার এই পথচলা কেবল গবাদিপশুর খাবার সংগ্রহের গল্প নয়, বরং এটি আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য। তার এই জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মনের জোর আর ভালোবাসার কাছে বয়স ও দৈন্যতা সবসময়ই হার মানে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}