সমাজ, সংসার কিংবা কর্মক্ষেত্র—প্রতিটি জায়গায় মানুষের পথচলার মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। আমরা যাদের সবচেয়ে কাছের ভাবি, যাদের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করি, দিনশেষে যখন তাদের হাত ধরেই সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে, তখন শুধু বিশ্বাসই ভাঙে না, বরং মানুষের পুরো মেরুদণ্ডটাই ভেঙে পড়ে।

আমাদের লোকসংস্কৃতির চিরন্তন প্রবাদ এবং ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এই নির্মম সত্যেরই বারবার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। যেমনটি আমরা প্রাচীন প্রবাদে বলি “সর্ষেয় ভূত”—যেখানে ভূত তাড়ানোর মূল অস্ত্র সর্ষের ভেতরেই গলদ লুকিয়ে থাকে, কিংবা যখন কৃষকের পরম যত্নে গড়া খেতের বেড়াই ফসলে মুখ দেয়, তখন সুরক্ষার আর কোনো পথ খোলা থাকে না। বাস্তব জীবনের নিষ্ঠুর সত্য হলো, যাদের আমরা সুরক্ষার দেয়াল ভাবি, যারা আমাদের খুব কাছাকাছি থেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, অথচ নিজের অবস্থানটুকুও এক চুল ছাড়ে না—তারাই ভেতরে ভেতরে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। এরা নিজেরা তো কোনো ভালো কাজ বা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেই না, কেউ যে একটু দাঁড়িয়ে পাশে থেকে সহায়তা করবে, সেই পথও রুদ্ধ করে দেয়। উল্টো দায়িত্বের চেয়ার ও সুযোগ আঁকড়ে ধরে রেখে এরা সমাজ বা প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে খোকলা করে ফেলে এবং একটুখানি সুযোগ পেলেই বিষাক্ত সাপের মতো পুনরায় ছোবল মারতে চেষ্টা করে।

​ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য চরিত্র মীর জাফর আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছে যে, প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে ঘরের ভেতরের এই নীরব ঘাতক ও মুনাফিকরা অনেক বেশি বিপজ্জনক। মীর জাফর নবাবের প্রধান সেনাপতি হয়েও যুদ্ধের মাঠে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থেকে যেভাবে বাংলার পরাজয় নিশ্চিত করেছিল, আজকের সমাজেও সেই মানসিকতার মানুষের অভাব নেই। এরা পরম বন্ধু সেজে পাশে থাকে, মুখে আনুগত্যের ভণ্ডামি দেখায়, কিন্তু অন্তরে পোষণ করে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এদের এই দ্বিচারিতা ও নোংরা মানসিকতার কারণে সৎ, কর্মঠ ও ভালো কাজ করতে চাওয়া মানুষেরা আজ এক চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যেন এই দমবন্ধ করা চক্র থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগই মিলছে না।

তবে এই চিরচেনা বিশ্বাসঘাতকতার জাল ছিঁড়ে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। এর জন্য প্রথমত অন্ধবিশ্বাস পরিহার করে মানুষের মুখের মিষ্টি কথার চেয়ে তার কর্ম ও সততাকে পরখ করতে শিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা দায়িত্বে থেকে অবহেলা করে এবং সুযোগ পেলেই পেছনে ছুরি মারে, তাদের চিনে নিয়ে সমাজ বা সংগঠন থেকে কঠোর হাতে নিষ্কাশন করতে হবে; তাদের আর অবস্থান আঁকড়ে ধরে রাখার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

সর্ষের ভেতরের ভূত তাড়াতে হলে যেমন পুরো সর্ষেটাই বদলে ফেলতে হয়, ঠিক তেমনি আমাদের চারপাশের এই মুখোশধারীদের চিহ্নিত করে নিজেদের সুরক্ষার দেয়াল নিজেদেরই শক্ত হাতে নতুন করে গড়তে হবে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}