রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা যে মানবিক সৌহার্দ্য ও সৌজন্যতাবোধের সামনে কোনো দেয়াল হতে পারে না, উত্তরবঙ্গের প্রবীণ জননেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. দবিরুল ইসলামের শেষ বিদায়লগ্নে তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বৈরিতা ভুলে দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শামিল হলেন তাঁর বিদায়যাত্রায়।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনের টানা সাতবারের সাবেক এই সংসদ সদস্যের প্রয়াণে স্থানীয় রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন সম্প্রীতির আবহ তৈরি হয়েছে। প্রয়াত নেতার পরিবারকে সমবেদনা জানাতে তাঁর বাসভবনে ছুটে যান ওই আসনের বর্তমান বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ডা. আব্দুস সালাম।
সংবাদমাধ্যমকে ডা. আব্দুস সালাম বলেন, “ব্যস্ততার কারণে নামাজে জানাজায় উপস্থিত হতে না পারলেও, প্রয়াত প্রবীণ নেতার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা ও গভীর সমবেদনা জানাতে আমি তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম।” বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সৌজন্য সাক্ষাৎকে স্থানীয় মহল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘শান্তির সুবাতাস’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
লাখো মানুষের ঢল ও রাষ্ট্রীয় সম্মান
গত শনিবার (৩০ মে) বিকালে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার শহীদ আকবর আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ মাঠে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নামে লাখো মানুষের। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে মাঠ ও চারপাশের সংযোগ সড়ক। জানাজার পূর্বে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর সন্তানকে রাষ্ট্রীয় সম্মান বা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

জানাজায় দল-মত নির্বিশেষে অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। সেখানে দেওয়া স্মৃতিচারণামূলক বক্তব্যে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা আব্দুল হাকিম বলেন, “এলাকার যা কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন, তা দবিরুল ইসলামের হাত ধরেই হয়েছে।”
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হায়াত নুরুন্নবী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “তাঁর অবদানের কাছে বালিয়াডাঙ্গীবাসী চিরঋণী।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশংসা করে আইনজীবী ও সমাজকর্মীরা লিখেছেন, উপ-মহাদেশের সুস্থ ধারার রাজনীতির এটিই শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি। নীতি ও আদর্শের লড়াই মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্তরে নয়।
এক বর্ণিল রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান
১৯৪৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বালিয়াডাঙ্গীর বড়বাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করা দবিরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে মেধা ও জনমানুষের ভালোবাসায় তিনি টানা সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের অক্টোবর মাসে তিনি কারাবন্দি হন এবং চলতি বছরে জামিনে মুক্তি পান।
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগে গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকালে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

জানাজা শেষে বালিয়াডাঙ্গীর বড়বাড়ী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই অবিসংবাদিত নেতাকে। আর এর সঙ্গেই অবসান ঘটল উত্তরবঙ্গের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায়ের।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}