সংসারের অভাব-অনটন দূর করার স্বপ্ন ছিল অনেক দিনের। কিন্তু স্বল্প আয়ের সংসারে সেই স্বপ্ন যেন বারপবার আটকে যাচ্ছিল বাস্তবতার দেয়ালে। একদিন ইউটিউবে দেখা একটি ভিডিও বদলে দেয় জীবনযাত্রার পুরো গল্প।

কেঁচো দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের ছোট্ট উদ্যোগ থেকে আজ মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আয় করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার গৃহিণী নুরেশা আক্তার। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন আরও কয়েকজন নারীর জন্য।

উপজেলার রাতোর ইউনিয়নের আটকরা গ্রামের বাসিন্দা নুরেশা আক্তার বর্তমানে পরিচালনা করছেন ‘মেসার্স নুরেশা অ্যাগ্রো ফার্ম’। তার উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্টের সুনাম এখন শুধু রাণীশংকৈলেই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের কাছেও ছড়িয়ে পড়েছে।
নুরেশা আক্তার জানান, স্বামীর স্বল্প বেতনের চাকরির আয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই একদিন ইউটিউবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের একটি ভিডিও দেখেন।

সেখান থেকেই আগ্রহের শুরু। পরে অল্প কয়েকটি কেঁচো সংগ্রহ করে বাড়িতেই পরীক্ষামূলকভাবে জৈব সার উৎপাদন শুরু করেন। শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে, কিন্তু ধীরে ধীরে তার উৎপাদিত জৈব সারের চাহিদা বাড়তে থাকে। উদ্যোগের সম্ভাবনা দেখে পাশে দাঁড়ায় উপজেলা কৃষি বিভাগ। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি একটি প্রকল্পের আওতায় তাকে দেওয়া হয় ভার্মি কম্পোস্ট সেপারেটিং মেশিন, সিলিং মেশিন, উৎপাদন ঘর এবং পিট নির্মাণের সহায়তা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিওও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। সাফল্যের পথ আরও প্রশস্ত হয় ২০২৩ সালে।

বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় স্বামীও চাকরি ছেড়ে তার উদ্যোগে যুক্ত হন। এরপর তারা ‘ফসল বন্ধু জৈব সার’ নামে প্যাকেটজাত করে পণ্য বাজারজাত শুরু করেন। বর্তমানে তাদের খামারে রয়েছে দুটি উৎপাদন শেড, ১৫টি পিট ও ৫০টি রিং। এখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০ মেট্রিক টন ভার্মি কম্পোস্ট এবং ১০ কেজি কেঁচো উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতি কেজি ভার্মি কম্পোস্ট ১৫ টাকা এবং প্রতি কেজি কেঁচো ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সব ধরনের ব্যয় বাদ দিয়ে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা লাভ করছেন নুরেশা ও তার পরিবার। একই সঙ্গে তাদের খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও তিনজন নারীর। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জৈব সারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, তেমনি মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা হচ্ছে। ফলে নুরেশা আক্তারের মতো উদ্যোক্তারা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হচ্ছেন না, টেকসই কৃষি ব্যবস্থার প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
রাণীশংকৈল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, “ভার্মি কম্পোস্ট মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। নুরেশা আক্তারের উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে গ্রামীণ নারীরাও সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারেন। তার এই সাফল্য অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছে।”

সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট একটি উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্তে। নুরেশা আক্তারের গল্প শুধু একজন নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনি নয়; এটি গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}