ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে মানবিক সংকটের এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তা প্রতিহত করে। এরপর থেকে ওই ব্যক্তিরা দুই দেশের মধ্যবর্তী নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাভাষী কয়েকজন নারী, পুরুষ ও শিশুকে একত্র করা হয়। পরে শুক্রবার গভীর রাতে হরিপুরের মশালগাঁও সীমান্তের ৩৪৯ নম্বর মেইন পিলারের ৭ নম্বর সাব-পিলার এলাকার একটি সীমান্ত গেট দিয়ে তাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ।

বিজিবি সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেন। এতে পুশব্যাকের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে এরপর থেকে ১১ জন ব্যক্তি সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুরুষ, চারজন নারী ও চারটি শিশু রয়েছে। একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা বলেও জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রচণ্ড গরম ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন।

শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিজিবির মশালগাঁও ক্যাম্প ও বিএসএফের বাহারগাঁও ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠকে কোনো সমাধান হয়নি।

দিনাজপুর-৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, বিএসএফ দাবি করছে, ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, “যথাযথ পরিচয় যাচাই এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষ হস্তান্তরের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।”

শনিবার বিকেলে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। শিশুদের কেউ কেউ পানির সংকটে কষ্ট পাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক আবু তাহের বলেন, “ছোট ছোট শিশুদের কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। মানবিক দিক বিবেচনায় দ্রুত একটি সমাধান হওয়া প্রয়োজন।”

স্থানীয় বাসিন্দা হালিমা বেগম বলেন, “একজন মা তাঁর শিশুদের রোদ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। দৃশ্যটি খুবই কষ্টের।”

মানবাধিকারকর্মীরা ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, সীমান্ত পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, নারী ও শিশুদের মৌলিক মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট মৌসুমী রহমান বলেন, “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসার অধিকার রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের রাখা উদ্বেগের বিষয়।”

এদিকে একই দিনে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড়ের শাহানাবাদ-পামোল সীমান্তে এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে বিএসএফের বিরুদ্ধে।

বিজিবি সদস্যরা তাঁকে আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারেন, তিনি ভারতীয় নাগরিক। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে বিএসএফের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।

ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজির আহম্মদ বলেন, “আটক ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

সীমান্তের দুটি পৃথক ঘটনায় নতুন করে পুশব্যাক ইস্যু সামনে এসেছে। পরিচয় যাচাই ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান না হলে মশালগাঁও সীমান্তের মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}