”ভালো করে পড়াশোনা করো, নইলে জীবনে কিছুই করতে পারবে না।”—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই চেনা উপদেশটি শোনেননি। শৈশব থেকেই আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে—এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্স—এই দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই বুঝি জীবনের সাফল্য নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন জাগে—সত্যিই কি তাই? একজন শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের মূল্যবান আরও সাত-আট বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটায়। বিপুল অর্থ, শ্রম ও সময়ের বিনিময়ে দিনশেষে তার হাতে আসে কয়েকটি কাগজের সনদপত্র। এরপরই শুরু হয় আরেক নির্মম যুদ্ধ—চাকরির জন্য দৌড়ঝাঁপ। বিসিএস, ব্যাংক, এনজিও কিংবা করপোরেট অফিস—যেদিকেই তাকানো যায়, শুধু হাজার হাজার বুভুক্ষু আবেদনকারীর দীর্ঘ লাইন। দেখতে দেখতে অনেকের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে যায়, অথচ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসে না। তাহলে এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার প্রকৃত অর্জন কী? আমরা কি আসলে শিক্ষার নামে কেবল ‘সনদ উৎপাদনের কারখানা’ বানিয়েছি? অবশ্যই শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কিন্তু শিক্ষা আর সনদ যে এক জিনিস নয়—এই সাধারণ সত্যটি আমরা ভুলে গেছি।
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এই দুইটিকে এমনভাবে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে যে, মানুষ ধরে নিয়েছে ডিগ্রি মানেই শিক্ষা, আর শিক্ষা মানেই একটা চাকরি। অথচ বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হচ্ছে ‘দক্ষতা’। আপনি যদি একটি সফটওয়্যার তৈরি করতে পারেন, একটি সফল ব্যবসা দাঁড়ানার সামর্থ্য রাখেন, কিংবা একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, গ্রাফিক ডিজাইনার, ভিডিও এডিটর বা ডিজিটাল মার্কেটার হতে পারেন—তবে বাজারে আপনার সরাসরি মূল্য আছে। পক্ষান্তরে, চার বছর ধরে কেবল মুখস্থ বিদ্যার জোরে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখে পাওয়া একটি সনদের বাজারমূল্য কতটুকু, তা আজকের বেকারত্বের উচ্চ হারই বলে দিচ্ছে। সমস্যাটা আসলে আমাদের শিকড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে। তৎকালীন শাসকদের প্রয়োজন ছিল প্রশাসনিক কাজ চালানোর জন্য কিছু অনুগত কেরানি ও নিম্নস্তরের কর্মকর্তা তৈরি করা। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হওয়ার পরও আমরা সেই দাসত্বমূলক কাঠামোর বড় অংশটাই বয়ে বেড়াচ্ছি। সিলেবাস বদলেছে, ঝকঝকে বই এসেছে, কিন্তু শিক্ষার মূল ‘দর্শন’ বদলায়নি। আজও একজন শিক্ষার্থী বারো বছর ইংরেজি পড়েও দুটো অনুচ্ছেদ শুদ্ধ করে লিখতে পারে না। গণিত পড়েও বাস্তব জীবনের সাধারণ আর্থিক হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়।
বিজ্ঞান পড়ে জিপিএ-৫ পায়, কিন্তু তার ভেতর বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা বা যৌক্তিক মানসিকতা গড়ে ওঠে না। এর দায় কিন্তু শিক্ষার্থীর নয়; গলদটা ব্যবস্থার ভেতরেই। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চীন, জাপান, জার্মানি বা দক্ষিণ কোরিয়া অনেক আগেই বুঝে গেছে—সবাইকে ধরে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো কোনো জাতির উন্নয়নের পথ হতে পারে না। একজন দক্ষ কারিগর, টেকনিশিয়ান বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অর্থনৈতিক অবদান অনেক সময় একজন সাধারণ গ্র্যাজেউয়েটের চেয়ে বহুগুণ বেশি। জার্মানিতে ভোকেশনাল বা কারಿಗরি শিক্ষা এতটাই শক্তিশালী যে, বহু শিক্ষার্থী স্বেচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে সরাসরি দক্ষতা অর্জনের পথ বেছে নেয়। সেখানে একে ব্যর্থতা ভাবা হয় না, বরং বাস্তবসম্মত ক্যারিয়ার হিসেবে দেখা হয়। অথচ আমাদের সমাজে এখনো “ছেলে বা মেয়ে কী করে?” প্রশ্নের সবচেয়ে জাদুকরী ও গ্রহণযোগ্য উত্তর হলো—”বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।” সে কী শিখছে, কী দক্ষতা অর্জন করছে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সে কতটুকু প্রস্তুত—এসব প্রশ্ন এখানে চিরকালই গৌণ থেকে যায়। ভুলে গেলে চলবে না, আমরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে বাস করছি। যেসব অফিসভিত্তিক রুটিন কাজের জন্য আগে হাজার হাজার গ্র্যাজেউয়েট নিয়োগ দেওয়া হতো, আগামী এক দশকে তার বড় অংশই স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড হয়ে যাবে। ফলে, শুধুমাত্র তথ্য মুখস্থ রাখা বা নিয়ম মেনে কাজ করার দিন শেষ।
আগামী পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতে, যাদের থাকবে সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা। তাই প্রশ্নটা উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—বর্তমান কাঠামোর উচ্চশিক্ষা আমাদের তরুণদের কতটা কার্যকর করে তুলছে? চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষক বা আইনজীবী তৈরির জন্য উচ্চশিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের প্রতিটি তরুণকে জোর করে একই ছাঁচে ঢালতে যাওয়া চরম আত্মঘাতী। একটি সচল জাতির জন্য যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সমানভাবে প্রয়োজন দক্ষ কারিগর, আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা, আইটি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী এবং উদ্ভাবক। আমরা যদি সবাইকে জোর করে একই সনদের ছাঁচে ঢালতে চাই, তবে দিনশেষে আমাদের প্রাপ্তি হবে একটাই—সনদের পাহাড় এবং দক্ষ মানবসম্পদের চরম সংকট। সময় এসেছে শিক্ষাকে সনদের মোহ থেকে মুক্ত করার। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবী মানুষকে তার ডিগ্রির কাগজ দেখে নয়, তার কাজের সক্ষমতা দেখে মূল্যায়ন করবে। আর যে শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের সেই সক্ষমতা তৈরি করতে পারে না, তা যত পুরোনো বা মর্যাদাপূর্ণই হোক না কেন—তা ভেঙে নতুন করে গড়ার সময় এখনই।
Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}