বন্য পাখি ডানা মেলে নীল আকাশে উড়বে এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। আকাশছোঁয়া উচ্চতা আর তীক্ষ্ণ শিকারি স্বভাবের কারণে যে পাখি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই অভ্যস্ত, সে কিনা এখন এক গ্রামীণ বৃদ্ধের পরম সুহৃদ । হিংস্র ও শিকারি হিসেবে পরিচিত এক বিপন্ন ঈগল পাখি আর এক মানুষের অবুঝ ভালোবাসার এমন এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে উত্তর জনপদের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায়। প্রকৃতি আর মানুষের এই বিরল ও অকৃত্রিম সখ্যতার দৃশ্য দেখে এখন মুগ্ধ পুরো এলাকাবাসী, এই অনন্য মানবিক সম্পর্কের পেছনের মানুষটি হলেন, রাণীশংকৈল উপজেলার বাচোর ইউনিয়নের দোশিয়া রাজবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মোতালেব হোসেন। পেশায় তিনি একজন সাধারণ হাসকিং মিলের চালক। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোতালেব হোসেনের বাড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত ঐতিহাসিক রাজা টংকনাথের রাজবাড়ী। তিনমাস আগে সেখানকার একটি বিশাল, প্রাচীন শিমুল গাছের নিচে ডানা ঝাপটাতে থাকা এক ঈগল পাখির ছানা কুড়িয়ে পান তিনি।

ঝড়-বৃষ্টি কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় মা-বাবা হারা, উড়তে না পারা অবুঝ ও বিপন্ন এই ছানাটিকে দেখে মোতালেবের মনে জেগে ওঠে গভীর মমতা। পরম স্নেহে সেটিকে বুকে জড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসেন তিনি। এরপরই শুরু হয় এক শিকারি পাখিকে পরম যত্নে সন্তান স্নেহে বড় করে তোলার গল্প। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মোতালেব হোসেন বলেন, এই ঈগল পাখিটি এখন আমার একমাত্র পরম বন্ধু। ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতো পরম যত্নে আমি এটিকে লালন-পালন করছি। প্রতিদিন নিয়ম করে ওকে মাছ, মাংসসহ নানা পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হয়। পাখির প্রতি নিজের পুরোনো টানের কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমাকে ছাড়া ঈগলটি এখন একটি মুহূর্তও থাকতে পারে না। আমি যখন আমার কর্মস্থল হাসকিং মিলে কাজ করতে যাই, ও ডানায় ভর করে আমার সাথে চলে আসে। সারাদিন আমার আশেপাশেই থাকে, খেলাধুলা করে। সত্যি বলতে, ওর বাবা-মা বলতে এখন আমিই। সাধারণত ঈগল পাখি গভীর বনাঞ্চল, বড় জলাশয় বা মানুষের কোলাহলমুক্ত উঁচু গাছের ডালে বাসা বাঁধে।

প্রখর দৃষ্টি আর ক্ষিপ্রগতির এই পাখিটি মানুষের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলতেই ভালোবাসে। পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস, প্রাচীন ও উঁচু গাছ কেটে ফেলা এবং খাদ্যের তীব্র সংকটে বাংলাদেশে আজ ঈগলের মতো শিকারি পাখিগুলো চরম বিলুপ্তির মুখে। প্রকৃতি থেকে যখন এই রাজকীয় পাখিরা হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক তখনই রাণীশংকৈলের এই ঘটনাটি পরিবেশবাদী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে। মোতালেবের এই ঈগল বন্ধুটি সাধারণ বন্য স্বভাবের চেয়ে একেবারেই ব্যতিক্রম। সে যেন মোতালেবের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই বিরল ও অবিশ্বাস্য বন্ধুত্বের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন মোতালেব হোসেনের হাসকিং মিলে দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। বিপন্নপ্রায় এই ঈগল পাখিটিকে একনজর দেখতে, তার সাথে ছবি তুলতে এবং তার চঞ্চলতা দেখে আনন্দে মেতে উঠছেন সব বয়সী দর্শনার্থী। প্রকৃতি আর মানুষের এই সুগভীর মেলবন্ধন আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে, ভয় বা খাঁচায় বন্দি করে নয়, খাঁটি ভালোবাসা আর সহানুভূতি দিয়ে বন্য প্রাণীকেও আপন করে নেওয়া সম্ভব। মোতালেব ও তার ঈগল বন্ধুর এই হৃদয়ছোঁয়া গল্প এখন রানীশংকৈলের মানুষের মুখে মুখে।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}