প্রতিটি শিশুর জন্ম হয় স্বপ্ন নিয়ে, সম্ভাবনা নিয়ে এবং সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা নিয়ে। একটি শিশুর হাতে বই, খাতা ও খেলনা থাকার কথা; কিন্তু বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে বিশ্বের অসংখ্য শিশুর হাতে আজও শ্রমের বোঝা তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ শৈশব থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। এই মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাতে প্রতি বছর ১২ জুন পালিত হয় আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস।

শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। একটি শিশু যখন বিদ্যালয়ের পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রে সময় কাটায়, তখন সে শুধু শিক্ষার সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হয় না, বরং তার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুশ্রম একটি দেশের উন্নয়নকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কারণ এটি দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরির পথে বড় অন্তরায়।

বাংলাদেশে শিশুশ্রম হ্রাস এবং শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক অগ্রগতি আনতে সহায়তা করছে। তবে এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্মসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে অনেক শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাই এ সমস্যার সবচেয়ে বেশি শিকার।

দারিদ্র্য শিশুশ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে উপার্জনের কাজে নিয়োজিত করে। এছাড়াও সামাজিক সচেতনতার অভাব, পারিবারিক অস্থিরতা শিশুশ্রম বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তাই শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোকেও সমাধান করতে হবে।

শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে।

আমাদের তরুণ সমাজও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যুব সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে শিশুশ্রম প্রতিরোধে অবদান রাখতে পারে। একটি শিশুর মুখে হাসি ফোটানো এবং তার শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পূর্বশর্ত।

আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ, আনন্দময় ও মর্যাদাপূর্ণ শৈশব নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গঠনের প্রত্যয় গ্রহণ করি, যেখানে কোনো শিশুকে জীবিকার তাগিদে শ্রমে নয়, বরং শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে দেখা যাবে। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই আমরা একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারব।

লেখক:
মোঃ শাফায়াত হোসেন (সিয়াম)
শিক্ষার্থী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর,
ইয়ুথ নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট (ওয়াইএনডি)।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}