প্রকৃতির অমোনিয় টানে নদীমাতৃক বাংলার রূপ ও সুর আজও মানুষকে মুগ্ধ করে। মেঘ কিংবা রোদের লুকোচুরি আর নদীর কুলকুল ধ্বনিতে হারিয়ে যায় জীবনের সব ক্লান্তি। এক সময় নদীগুলোতে সারি সারি পাল তোলা নৌকার যে অপরূপ দৃশ্য দেখা যেত, তা আজ কালের বিবর্তনে অনেকটাই স্মৃতি। এখনো নদী আছে, শিল্পীদের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গানও আছে; কিন্তু সেই বাতাসে ওড়ানো রঙিন পালের নৌকা খুব একটা চোখে পড়ে না।
নদী আর নৌকা আবহমান গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষা কিংবা হেমন্তের সকালে যখন পাল তোলা নৌকাগুলো নদীর বুকে ভেসে বেড়াতো, তখন মনে হতো যেন দিগন্তের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা নেমে এসেছে। মাঝির বৈঠা আর পালের বাতাসে তৈরি হতো এক অদ্ভুত সুর, যা কবি ও শিল্পীদের সবসময়ই অনুপ্রাণিত করেছে।
আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় ও যাতায়াত ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে আজ ইঞ্জিনচালিত নৌকার আধিপত্য বেড়েছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনেক নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বাতাসনির্ভর পাল তোলা নৌকা আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের কাছে পাল তোলা নৌকা এখন রূপকথার গল্পের মতো। নদী পারাপারে রঙ-বেরঙের পালের নৌকা এখন আর সচরাচর দেখা যায় না।
প্রবীণ মাঝিরা আজও নদীর বুকে ভাটিয়ালি বা জারি গান গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন। নদীর বুকে গান ভেসে এলেও মাঝির শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আর পালের ওড়াউড়ি চোখে পড়ে না। আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে গেছে সেই আমেজ। তবে আবহমান বাংলার এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও শিল্পীর সুরের মূর্ছনা আমাদের সংস্কৃতিকে চিরকাল সমৃদ্ধ করে রাখবে।